ফিচার

ভাসমান বাগানের নগরী: বরিশালের পেয়ারা রাজ্য


নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:০৫ পিএম

ভাসমান বাগানের নগরী: বরিশালের পেয়ারা রাজ্য
নৌকা ভ্রমণ আর ভাসমান বাজারের সমন্বয়। ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলকে অনেকে বলে “পেয়ারা নগরী”। বরিশাল, ঝালকাঠি আর পিরোজপুর অঞ্চলের ভাসমান পেয়ারা বাগান শুধু কৃষি নয়, এক অনন্য ঐতিহ্যও বটে। শত বছরেরও বেশি সময় আগে এই অঞ্চলের কৃষকেরা যখন জমি জলের নিচে তলিয়ে যেতে দেখলেন, তখন তারা কচুরিপানার ভেলা ও বাঁশ ব্যবহার করে ভাসমান বাগানের ধারণার তৈরি করেন।

স্থানীয়ভাবে যাকে বলা হয় “ধাপ চাষ”। এই ধাপগুলোতে মাটি চাপিয়ে চারা রোপণ করা হয়। আর আমাদের প্রিয় মৌসুমি বর্ষায় এভাবে গড়ে ওঠে ভাসমান বাগান, যা আজ UNESCO-র “Globally Important Agricultural Heritage System” স্বীকৃতি পেয়েছে।

বরিশালের পেয়ারা শুধু দেশেই নয়, দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়। একসময় বরিশালের পেয়ারা রাজধানী ঢাকায় আনা হতো নৌকায়, এখন আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থায় দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। কৃষকেরা পেয়ারা বিক্রি করে আয় করেন, পাশাপাশি ভাসমান জমিতে আমড়া,নারিকেল, শাকসবজি, আদা ও হলুদও উৎপাদন করেন ও তা বিক্রি করেন। এই কৃষি ব্যবস্থা এ অঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে। অনেকে বলেন, বরিশালের কৃষকের জীবনে ভাসমান বাগান যেন একটি আশীর্বাদ, কারণ এটি তাদেরকে বর্ষা মৌসুমেও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়েছে। একজন স্থানীয় কৃষকের কথায়—“আগে বর্ষায় জমি পানির নিচে থাকত, কিছুই করা যেত না। এখন ভাসমান ধাপে ফসল ফলিয়ে পরিবারের খরচ চালানো যায়।” এর মধ্য দিয়েই বোঝা যায় ভাসমান কৃষি কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সংগ্রামের ইতিহাস।

কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি এই বাগান এখন এক বড় পর্যটন আকর্ষণ। বর্ষাকালে হাজারো পর্যটক নৌকায় চড়ে গাবখান চ্যানেল বা বানারীপাড়ার খালঘাটে ঘুরতে যান। চারপাশে পানির উপর সবুজ ভাসমান বাগান আর নৌকার পর নৌকা ভর্তি পেয়ারা—এ যেন স্বপ্নময় দৃশ্য। পর্যটকেরা সেখান থেকে নৌকায় বসেই পেয়ারা কেনেন, ছবি তোলেন, প্রকৃতির সাথে সময় কাটান। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসা, নৌকা ভাড়া, বাজার ও হোটেলগুলোও এ কারণে চাঙা হয়। ফলে কৃষির পাশাপাশি পর্যটনও এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

 

payara-2-Dhaka Prokah News-04-09-2025.jpg
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

তবে এই জনপ্রিয়তার সাথে সাথে সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। পর্যটকেরা অনেক সময় খালে প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের মোড়ক ফেলে দেন। এতে পানির মান নষ্ট হচ্ছে, মাছ মারা যাচ্ছে, আর ভাসমান বাগানগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকেরা অভিযোগ করেন, আগের মতো পানি আর স্বচ্ছ নেই, দূষণের কারণে ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন—এভাবে চলতে থাকলে বরিশালের ভাসমান বাগানের ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। প্রকৃতির সঙ্গে তৈরি এই দুর্লভ কৃষি ঐতিহ্য যদি দূষণে নষ্ট হয়, তবে ক্ষতি শুধুমাত্র কৃষকের নয়, পুরো অঞ্চলের হবে।

এখন সমাধান বের করা জরুরি। স্থানীয় প্রশাসন ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ চাইলে নিয়ম-কানুন কঠোর করতে পারে, যেমন পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট নৌকা ও গাইড বাধ্যতামূলক করা, খালে আবর্জনা ফেলা বন্ধে জরিমানা চালু করা, এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালানো। একইসাথে কৃষকদের জন্য পরিবেশবান্ধব চাষাবাদের প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। পর্যটনকে টেকসইভাবে পরিচালনা করা গেলে অর্থনৈতিক উন্নতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণ পাশাপাশি সম্ভব।

ভাসমান পেয়ারা বাগান শুধু একটি কৃষি ব্যবস্থা নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা ঐতিহ্য, অর্থনীতি আর সংস্কৃতির প্রতীক। যদি সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে এটি বাংলাদেশের জন্য আরও বড় পর্যটন ও রপ্তানি সম্ভাবনা তৈরি করবে। কিন্তু যদি অব্যবস্থাপনা আর দূষণ অব্যাহত থাকে, তবে হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের ঐতিহ্য। বরিশালের ভাসমান পেয়ারা বাগান আমাদের শেখায়, প্রকৃতির সাথে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকার এক অসাধারণ কৌশল। এখন দায়িত্ব আমাদের—এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখা, যাতে আগামী প্রজন্মও নৌকায় ভেসে পেয়ারা কেনার আনন্দ উপভোগ করতে পারে।

লেখক: মারুফা জাহান মুমু 
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি