স্বাস্থ্য

কেন পুরুষের তুলনায় নারী বেশিদিন বাঁচে? বিজ্ঞান কি বলে?


স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৫, ০৬:০৩ পিএম

কেন পুরুষের তুলনায় নারী বেশিদিন বাঁচে? বিজ্ঞান কি বলে?
ছবি: সংগৃহীত

আইরিশ দুর্ভিক্ষ,ট্রিনিদাদে দাসত্ব ও আইসল্যান্ডে হামের মহামারীর মতো চরম পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকা মানুষদের মধ্যে একটি মিল রয়েছে: নারীরা পুরুষদের তুলনায় দীর্ঘজীবী হন।

এর কারণ হলো, নারীদেহ জন্মগতভাবে সহনশীলতা ও দীর্ঘায়ু অর্জনের জন্য গঠিত 

জটিল প্রজনন অঙ্গ ও মাসিক, গর্ভধারণ, সন্তান জন্মদান ও স্তন্যপানের মতো কখনো কখনো প্রাণঘাতী প্রক্রিয়ার বোঝা থাকা সত্ত্বেও, নারীদেহ সাধারণত পুরুষদেহের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী হয়। যদিও অনেক জায়গায় মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কম খাবার, চিকিৎসা ও অন্যান্য সম্পদ পায় তারপরও তারা বেশি দিন বাঁচে।

 

women 111.jpg
ছবি: সংগৃহীত

নারীর এই সহনশীলতা চরম পরিস্থিতিতেও সত্যি বলে প্রমাণিত হয়, যেমন ইতালির পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ভার্জিনিয়া জারুল্লি সাতটি ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠীর উপর গবেষণা করে দেখেছেন। এই জনগোষ্ঠীগুলো দুর্ভিক্ষ, মহামারি ও দাসত্বের মতো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল।

২০১৮ সালে PNAS জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ইউক্রেন, আয়ারল্যান্ড ও সুইডেনে দুর্ভিক্ষ, ট্রিনিদাদে দাসত্ব ও আইসল্যান্ডে হামের মহামারীর মতো ভয়াবহ অবস্থায়ও নারীরা সব বয়সেই পুরুষদের তুলনায় বেশি বেঁচে থাকতেন। এমনকি সেই সময়কার সদ্যজাত কন্যাশিশুরাও কিশোরদের তুলনায় বেশি টিকে থাকত যা স্পষ্ট করে যে নারীদের এই জীবিত থাকার ক্ষমতা জৈবিকভাবেই নিহিত।

এই জৈবিক পার্থক্যগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া ও এর ভিত্তিতে চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা গেলে যেমন ক্যানসারের চিকিৎসা বা টিকা প্রদানের নিয়মে — স্বাস্থ্যসেবাকে আরও নিখুঁত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও নারীদের জন্য কার্যকর করে তোলা সম্ভব।

নারী ক্রোমোজোম ও হরমোন:
জন্মসূত্রে নারী হিসেবে যাদের লিঙ্গ নির্ধারিত হয়, তাদের থাকে দুটি X ক্রোমোজোম যা XY ক্রোমোজোমবিশিষ্ট পুরুষদের তুলনায় একটি মৌলিক জেনেটিক সুবিধা। X ক্রোমোজোম অনেক বড়, এতে প্রায় ১০ গুণ বেশি জিন থাকে। ফলে নারীদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় অনেক বেশি বৈচিত্র্য ও শক্তি থাকে।

ড. শ্যারন মোয়ালেম “The Better Half: On the Genetic Superiority of Women” বইতে লিখেছেন, “নারীরা জিনগতভাবে এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে তারা পুরুষদের তুলনায় দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিজেকে রূপান্তর করতে পারে।” কারণ ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াগুলো সব সময় পরিবর্তিত হয়  ফলে এমন একটি ইমিউন সিস্টেম দরকার, যা দ্রুত অভিযোজিত হতে পারে।

এছাড়াও, নারীদের শরীরে সাধারণত বেশি ইস্ট্রোজেন থাকে, যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় আরও নানা সুবিধা দেয়।

নারীদেহে থাকে সক্রিয় নিউট্রোফিল (সাদা রক্ত কণিকা, যা সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে) ও B সেলের কার্যকারিতাও শক্তিশালী হয়। যেগুলো ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এসব প্রতিরোধ ব্যবস্থার পেছনে হরমোন, জিন ও অন্যান্য কারণ কীভাবে কাজ করে, তা নিয়ে গবেষণা চলছে।

নারীরা সংক্রমণের বিরুদ্ধে আরও বেশি লক্ষ্যভিত্তিক অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে ‘ইমিউনোলজিক্যাল মেমোরি’ ধরে রাখতে পারে যার মানে ভবিষ্যতের সংক্রমণের বিরুদ্ধে তাদের প্রস্তুতি বেশি। এ কারণেই পুরুষরা সাধারণভাবে অনেক রোগের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হন, যদিও তা সব রোগে বা সব ব্যক্তির ক্ষেত্রে নয়।

তবে নারীদের এই শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটা নেতিবাচক দিকও আছে  তারা পুরুষদের তুলনায় বেশি অটোইমিউন রোগে ভোগেন এবং অনেক সময় এমন দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা নিয়ে বেঁচে থাকেন, যা পুরুষদের প্রাণঘাতী হতে পারত।

টেস্টোস্টেরনের প্রভাব:
টেস্টোস্টেরন — যা পুরুষদের শরীরে বেশি থাকে। রোগ প্রতিরোধে এক ধরনের অসুবিধা তৈরি করে। মার্লিন জুক বলেন, প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, যদি পুরুষ প্রাণীর অণ্ডকোষ অপসারণ করা হয়, তাহলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে আর যদি নারী প্রাণীকে টেস্টোস্টেরন দেওয়া হয়, তাহলে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

women 333.jpg
ছবি: সংগৃহীত.

এটা হতে পারে কারণ টেস্টোস্টেরন পুরুষদের জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে উপভোগ করা ও কম আয়ুর দিকে ঠেলে দেয়  যাতে তারা দ্রুত প্রজননে সফল হতে পারে।

শারীরিক গঠন ও সংস্কৃতি:
কিছু গবেষক মনে করেন, পুরুষদের কম আয়ুর জন্য জীবনধারা ও সংস্কৃতি অনেকাংশে দায়ী। তারা নারীদের তুলনায় বেশি ধূমপান, মদ্যপান ও ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে লিপ্ত হন এবং শারীরিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও বেশি নিয়োজিত থাকেন।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, যখন নারীরা পুরুষদের মতো অনিয়মিত জীবনযাপন শুরু করে, তবুও      তারা সাধারণভাবে পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বেঁচে থাকেন। জারুল্লি বলেন, “যেখানে পুরুষ ও নারী এক ধরনের জীবনধারা অনুসরণ করে, সেখানেও দেখা যায় নারীদের গড় আয়ু বেশি।”

নারীদেহের গঠনগত সুবিধা:
এই নারীর সুবিধা শুধু জেনেটিক বা হরমোন-ভিত্তিক নয়, এটি শরীরের গঠনেও নিহিত। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজিস্ট এরিন ম্যাককেনি ও ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজিস্ট আমান্ডা হেল গবেষণা করে দেখেছেন, মহিলাদের ক্ষুদ্রান্ত্র পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বড়, যা খাবার থেকে বেশি পুষ্টি আহরণে সহায়তা করে।

PeerJ জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত গবেষণায় তারা বলেন, “নারীদেহ গর্ভধারণ ও স্তন্যপানের সময় অতিরিক্ত পুষ্টির প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম আর এই পুষ্টি মূলত ক্ষুদ্রান্ত্র থেকে শোষিত হয়।”

এটি হতে পারে তথাকথিত Female Buffering Hypothesis–এর একটি প্রমাণ  অর্থাৎ নারীদেহ প্রকৃতিগতভাবে বেশি চাপ সহ্য করার জন্য বিবর্তিত হয়েছে।