ইতিহাস-ঐতিহ্য

বাংলার বাঘ ‘হক সাহেব’-এর জন্মদিন আজ


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫, ০৬:০৩ পিএম

বাংলার বাঘ ‘হক সাহেব’-এর জন্মদিন আজ
শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক। ছবি: সংগৃহীত

আজ ২৬ অক্টোবর, মহান নেতা আবুল কাসেম ফজলুল হক—জনপ্রিয়ভাবে পরিচিত ‘শের-ই-বাংলা’ বা ‘বাংলার বাঘ’—এর জন্মদিন। ১৮৭৩ সালের এই দিনে বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া মিঞাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।

বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এ কে ফজলুল হক এক অনন্য নাম। ব্রিটিশ আমলে বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি ইতিহাসে স্থান করে নেন। তার নেতৃত্বে কৃষক, প্রজা ও সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নতুন গতি পায়।

ফজলুল হকের শৈশব কেটেছে শিক্ষানুরাগী পরিবেশে। তার পিতা কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন উপমহাদেশের প্রথমদিকের মুসলমান পদস্থ কর্মকর্তা; মাতা সাইদুন্নেসা খাতুন গৃহিণী হলেও শিক্ষিত ও ধর্মপ্রাণ নারী ছিলেন।

বাড়িতে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভর্তি হন বরিশাল জেলা স্কুলে। ১৮৮৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় ঢাকা বিভাগে মুসলমানদের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরে ১৮৯১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ১৮৯৩ সালে তিন বিষয়ে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। পরবর্তীতে গণিতে প্রথম শ্রেণিতে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। অল্পদিনের মধ্যেই নিজেকে দক্ষ আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে তার মূল পরিচয় রাজনীতিতে। বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনীতিক হয়ে ওঠেন।

তিনি কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭–১৯৪৩), পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৫) এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬–১৯৫৮) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক ছিলেন ‘কৃষক প্রজা পার্টি’–র প্রতিষ্ঠাতা। কৃষক ও নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাই ছিল তার রাজনীতির মূল দর্শন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এবং বাংলার কৃষক সমাজকে সংগঠিত করতে তার ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক।

১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের অধিবেশনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন এ কে ফজলুল হক। ওই প্রস্তাবই পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

১৯৫৩ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট, যা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ব্যাপক জয় পায়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করার সময় তিনি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলে তাকে গভর্নরের পদ থেকে অপসারণ করা হয়। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানেন তিনি।

ফজলুল হক প্রথমে নবাব আবদুল লতিফের পৌত্রী খুরশিদ তালাত বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের দুটি কন্যাসন্তান ছিল। স্ত্রী খুরশিদের মৃত্যুর পর তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন জিনাতুন্নেসা বেগমকে, তবে তিনিও অকালমৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি মীরাটের এক নারীকে বিয়ে করেন, তাদের সন্তান এ কে ফাইজুল হক ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পাট প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল শুক্রবার সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এ কে ফজলুল হক। পরদিন ঢাকার পল্টন ময়দানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন তিন নেতার মাজারে সমাহিত করা হয়। একই স্থানে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দিনও সমাহিত আছেন।

বাংলার রাজনীতিতে শের-ই-বাংলা শুধু একজন নেতা নন, ছিলেন বাঙালির আত্মমর্যাদার প্রতীক। কৃষক-প্রজা, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অবদান আজও ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।