সারাবিশ্ব
বিশ্ব শুধু পাঁচ শক্তির নয়, জাতিসংঘের ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্তির দাবি এরদোয়ানের
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) বর্তমান কাঠামো ও স্থায়ী সদস্যদের একচ্ছত্র ভেটো ক্ষমতার বিরুদ্ধে এবার সরব হয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ভারতের পর তুরস্কও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কাঠামো বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গে প্রকাশিত ‘দ্য ইউএন শুড অ্যাবোলিশ দ্য সিকিউরিটি কাউন্সিল ভেটো’ শীর্ষক এক মতামত নিবন্ধে এরদোয়ান নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে তার অবস্থান তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব পাঁচের চেয়ে বড়।’ তার মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মাত্র পাঁচটি দেশের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকা ন্যায়সংগত বা কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হতে পারে না।
এরদোয়ান বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিষদ এখনো মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি, সামরিক শক্তি, কূটনীতি ও ভূরাজনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ফলে একবিংশ শতাব্দীর নতুন সংকট মোকাবিলায় ১৯৪৫ সালের কাঠামোকে অপরিবর্তিত রেখে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা পরিচালনা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক মহামারি, জ্বালানি সংকট, আঞ্চলিক সংঘাত এবং এসবের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সৃষ্ট অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বের ভাগ্য মাত্র কয়েকটি দেশের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। তার মতে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল ও দেশের অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের ক্ষেত্রে শুধু নতুন কোনো দেশকে স্থায়ী সদস্য করা বা সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবকেও যথেষ্ট মনে করেন না এরদোয়ান। তার যুক্তি, নতুন কয়েকটি দেশকে বিশেষ ক্ষমতা দিলেই মূল সমস্যার সমাধান হবে না। বরং এতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ আরও কয়েকটি দেশের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে এবং বিদ্যমান বৈষম্যমূলক কাঠামোর পরিধি শুধু বড় হবে।
এরদোয়ানের মতে, অর্থবহ সংস্কারের প্রথম এবং মৌলিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি। তিনি মনে করেন, কোনো দেশকে নতুন করে বিশেষ ভেটো ক্ষমতা দেওয়ার পরিবর্তে বিদ্যমান ভেটো ব্যবস্থাই বাতিল করা প্রয়োজন। তার দৃষ্টিতে, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো একক রাষ্ট্রের এমন ক্ষমতা থাকা উচিত নয়, যার মাধ্যমে সে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে আটকে দিতে পারে।
ভেটো ক্ষমতা বিলুপ্তির পাশাপাশি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তিনি সাধারণ পরিষদের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। একইসঙ্গে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের পরিবর্তে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে সদস্য নির্বাচনের ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো দেশ একবার নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার পর পুনরায় সেখানে আসতে চাইলে তাকে আবারও সাধারণ পরিষদের সদস্য দেশগুলোর আস্থা অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ, কোনো দেশকে স্থায়ীভাবে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময় পরপর নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে। এরদোয়ানের মতে, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ পরিষদে এমন একটি শক্তিশালী ঐকমত্য গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে কোনো একটি রাষ্ট্র এককভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মিলিত ইচ্ছাকে স্থবির করে দিতে না পারে। তার মতে, জাতিসংঘকে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বৃহত্তর আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে এরদোয়ান বলেন, গত এক শতাব্দীর ঘটনাবলি প্রমাণ করেছে যে কোনো নির্দিষ্ট শক্তির ভারসাম্য বা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চিরস্থায়ী নয়। যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শান্তি, স্থিতিশীলতা ও যৌথ সমৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল, সেটি নতুন নতুন সংঘাত ঠেকানো, বৈষম্য কমানো এবং উদীয়মান শক্তিগুলোর উত্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কূটনীতিতে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল নতুন নতুন শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো সেই পরিবর্তনের সঙ্গে একই গতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি। যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত অভিবাসন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো এখন কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এগুলো আন্তঃদেশীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
এরদোয়ান এশিয়া ও আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে সরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে আফ্রিকার বিপুল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অনুপাতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও কার্যকর প্রতিনিধিত্বের দাবি তৈরি হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোও এখন নিজেদের অগ্রাধিকার ও স্বার্থ আগের তুলনায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে।
আঞ্চলিক সংকট সমাধানের ক্ষেত্রেও স্থানীয় বাস্তবতা ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট। তার মতে, কোনো অঞ্চলের সংকটের সমাধান শুধু বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে হওয়া উচিত নয়। বরং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দেশগুলোর সদিচ্ছা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং পারস্পরিক স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকা আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সক্ষমতাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।
বিশ্বায়নের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেছেন এরদোয়ান। তার মতে, বিশ্বায়ন সবার জন্য সমানভাবে সমৃদ্ধি ও সুযোগ নিশ্চিত করবে-এমন প্রত্যাশা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো বিদ্যমান এবং উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সুযোগের ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখোমুখি হচ্ছে।
এরদোয়ান বলেন, পরিবর্তনশীল বিশ্বে ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে বৈশ্বিক দায়িত্বগুলো আরও সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে। একইসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতির অধিকার এবং প্রয়োজনীয় অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। এর জন্য প্রয়োজন বৃহত্তর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতা।
সব মিলিয়ে এরদোয়ানের প্রস্তাবের মূল বক্তব্য হলো-একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। তার মতে, বিশ্ব এখন আর ১৯৪৫ সালের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আবদ্ধ নেই। তাই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও কেবল পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বিস্তৃত ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।