সারাবিশ্ব
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদ
বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক আপসহীন ও প্রভাবশালী নেত্রী হিসেবে তুলে ধরেছে এবং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সংগ্রাম ও অবদান বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে একটি কালের অবসান’ শিরোনামে প্রতিবেদনে জানায়, মঙ্গলবার সকালে ৮০ বছর বয়সে খালেদা জিয়ার মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনেক পর্যবেক্ষক মনে করছিলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনি আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও এক দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে এবং বুধবার তার জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
এএফপি আরও জানায়, দীর্ঘ অসুস্থতা ও কারাবাসের পরও খালেদা জিয়া গত নভেম্বর মাসে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের পর এটিই হতে যাচ্ছিল দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন—যা তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাকে ঘিরে আলোচনা বাড়িয়ে দেয়।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মারা গেছেন। প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কয়েক দশকের তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
রয়টার্স আরও জানায়, বিএনপি সূত্রে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। পাশাপাশি তার ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও হৃদ্রোগসহ একাধিক শারীরিক জটিলতা ছিল।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন’ শিরোনামে প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৯১ সালে দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী সরকারপ্রধান হন। বিবিসি তার নেতৃত্বকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির মামলাগুলোকে তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করতেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ মামলাটিতেও খালাস দিলে তিনি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা ফিরে পান—যা তার রাজনৈতিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং হাসিনার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়া ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন’ শিরোনামে প্রতিবেদনে জানায়, দুই নারী নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এক প্রজন্ম ধরে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২০ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর খালেদা জিয়ার পরিবার অন্তত ১৮ বার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি চাইলেও তা অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া: ক্ষমতা ও প্রতিরোধের এক জীবন’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাকে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ক্ষমতা, প্রতিরোধ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন।
পাকিস্তানের প্রভাবশালী দৈনিক ডন জানায়, দীর্ঘ অসুস্থতার পর খালেদা জিয়া মারা গেছেন। প্রতিবেদনে তার শারীরিক জটিলতা ও রাজনৈতিক জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানায়, ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনেকে ধারণা করছিলেন—আগামী নির্বাচনে তিনি বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটাতে পারেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার ভারতনীতি ও সার্বভৌমত্ব বিষয়ে অবস্থান নিয়েও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে এনডিটিভি।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই লিখেছে, “খালেদা জিয়া কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করা এক শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব।” মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও তার পরিচিতি তুলে ধরা হয় প্রতিবেদনে।
কলকাতাভিত্তিক বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা খালেদা জিয়ার জীবনকে তুলে ধরে লিখেছে, একসময় রাজনীতিতে অনাগ্রহী ফার্স্ট লেডি থেকে কীভাবে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠেন—সেই রূপান্তরের গল্প।
এছাড়াও ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তার প্রয়াণ শুধু একটি ব্যক্তিগত মৃত্যুসংবাদ নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান হিসেবেই প্রতিফলিত হয়েছে।