সারাবিশ্ব

গ্রিনহাউস গ্যাস শূন্য হলেও কমবে না জলবায়ু বৈষম্য, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম

গ্রিনহাউস গ্যাস শূন্য হলেও কমবে না জলবায়ু বৈষম্য, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে দরিদ্র দেশ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা গেলেও জলবায়ু পরিবর্তনের বৈষম্যমূলক প্রভাব দ্রুত দূর হবে না। বরং নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বৈশ্বিক নিঃসরণ ‘নেট জিরো’ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সবচেয়ে দেরিতে মুক্তি পাবে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো। বিশেষ করে বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত ক্রান্তীয় বা ট্রপিক্যাল অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত উষ্ণায়নের ঝুঁকিতে থাকবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও এর সুফল বিশ্বের সব অঞ্চলে সমানভাবে পৌঁছাবে না। বর্তমানের বৈষম্যমূলক উষ্ণায়নের প্রভাব কয়েক দশক ধরে টিকে থাকতে পারে। এমনকি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড অপসারণ করে ‘নেট-নেগেটিভ’ নিঃসরণে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এই বৈষম্য দ্রুত দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের ড. অ্যান্ড্রু কিংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাটি ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটার্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকরা গ্রিনহাউস গ্যাসের বৈশ্বিক নিঃসরণ শূন্যে পৌঁছালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রার পরিবর্তন কীভাবে ঘটতে পারে, তা বোঝার জন্য তিন ধরনের কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন। পরে মডেল থেকে পাওয়া ফলাফল বিভিন্ন দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

গবেষণার ফলাফল ব্যাখ্যা করে ড. অ্যান্ড্রু কিং বলেন, বিশ্ব যদি নেট জিরোর দিকে এগোয়, তাহলে বর্তমানে দেখা বৈষম্যমূলক উষ্ণায়ন দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকতে পারে। জলবায়ু সংকটের জন্য ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি দায়ী ধনী দেশগুলোই যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে, তা নয়। বরং তুলনামূলকভাবে কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক অঞ্চল অতিরিক্ত উষ্ণায়নের শিকার হচ্ছে।

কিংয়ের মতে, নেট জিরোতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বিশ্ব কত পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে নিঃসরণ করবে, তার ওপর দরিদ্র ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে। কারণ নেট জিরো অর্জিত হলেও বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রভাব সঙ্গে সঙ্গে শেষ হবে না। এর কিছু প্রভাব বহু শতাব্দী পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু বৈষম্যের মাত্রা কমাতে হলে বৈশ্বিক নিঃসরণ যত দ্রুত সম্ভব শূন্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। নেট জিরো অর্জনে যত বেশি সময় লাগবে, বিশেষ করে ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে তত দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও জলবায়ুজনিত ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো উচ্চ অক্ষাংশের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা তাদের ঐতিহাসিক স্বাভাবিক সীমার তুলনায় তুলনামূলকভাবে বেশি বেড়েছে। এর ফলে শুধু মানুষের জীবনযাত্রাই নয়, এসব অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রও দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে ট্রপিক্যাল অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর বা কোরাল রিফের মতো বাস্তুতন্ত্রের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এসব জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ পরিবেশ তুলনামূলকভাবে সংকীর্ণ তাপমাত্রার সীমার মধ্যে টিকে থাকার জন্য বিবর্তিত হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর উদ্যোগ চললেও তাপমাত্রার দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের কারণে এসব বাস্তুতন্ত্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এদিকে একই সময়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকির সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এবং পিটার ম্যাকমুলিন সেন্টার অন স্টেটলেসনেসের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু সংকট কীভাবে মানুষকে নাগরিকত্ব হারানো বা রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে ফেলছে, তা এখন আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

প্রতিবেদনটিতে বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ঝুঁকিতে থাকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব দেশের ভূখণ্ডের কিছু অংশ বা পুরো ভূখণ্ড জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়লে তাদের রাষ্ট্রসত্তা ও নাগরিকত্বের ধারাবাহিকতা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে আনুমানিক ৪৫ লাখ মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে। তবে রাষ্ট্রহীন মানুষের অনেকেই সরকারি নথি ও পরিসংখ্যানের বাইরে থাকায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দাবানল, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো জলবায়ুজনিত দুর্যোগে মানুষ বাস্তুচ্যুত হলে তাদের নাগরিকত্ব ও রাষ্ট্রীয় পরিচয় হারানোর ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক এবং প্রতিবেদনের সহ-লেখক রাধা গোভিল বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রহীনতার ঝুঁকির একটি স্পষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। তার মতে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগের পর শিশুদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক নথি সংরক্ষণ করা এই ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশগুলোর জনসংখ্যার তথ্য ও নাগরিকত্বের রেকর্ড ডিজিটালাইজ করা প্রয়োজন, যাতে দুর্যোগের পর মানুষ পরিচয় ও নাগরিকত্বের প্রমাণ হারিয়ে না ফেলে। একই সঙ্গে সন্তানকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে মায়েদের যেন বাবাদের মতো সমান অধিকার থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ যেসব দেশে মায়েদের এই অধিকার সীমিত, সেখানে দুর্যোগ বা বাস্তুচ্যুতির পরিস্থিতিতে শিশুদের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি শুধু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন্যা বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব মানুষের অর্থনীতি, জীবিকা, বাস্তুতন্ত্র, বাস্তুচ্যুতি এবং নাগরিকত্বের মতো মৌলিক বিষয়েও পড়তে পারে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলায় দ্রুত নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশ ও জনগোষ্ঠীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।