সারাবিশ্ব
দীর্ঘ বিক্ষোভের পর পদত্যাগ করলেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুচিচ
দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে অবশেষে পদত্যাগ করেছেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানী বেলগ্রেডে প্রেসিডেন্টের বাসভবন থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন তিনি। পদত্যাগের পর আগামীকাল সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করার কথা জানিয়েছেন ভুচিচ।
ভুচিচের পদত্যাগ এমন এক সময়ে হলো, যখন সার্বিয়ায় প্রায় দুই বছর ধরে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন চলছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নোভি সাদ শহরের রেলস্টেশনের ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। দুর্ঘটনাটিকে ঘিরে সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এরপর শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক, শ্রমিক, কৃষকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলনে যুক্ত হন।
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবি ছিল আগাম নির্বাচন এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ ও সমালোচনা ওঠে। সরকার অবশ্য এসব অভিযোগের অনেকগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে। দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের মধ্যেই ভুচিচ জুন মাসে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জানান, প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করবেন।
ভুচিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছেন। ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ২০২২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হন। দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগের মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়লেন। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির হয়ে ২৫ অক্টোবরের আগাম সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলটি তাকে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী করার পরিকল্পনা করেছে।
আগাম সংসদীয় নির্বাচন ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আয়োজন করতে হবে। ভুচিচের পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী সংসদের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে থাকবেন।
পদত্যাগের ঠিক আগে ভুচিচ আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে মোট ৪৯ জনকে ক্ষমা করার কথা জানান। তাদের মধ্যে ২৩ জন গত দেড় বছরের রাজনৈতিক ও আন্দোলন-সংক্রান্ত ঘটনাবলির সঙ্গে যুক্ত বলে ভুচিচ নিজেই জানিয়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ২৩ জনের মধ্যে ১২ জন নোভি সাদ-সংশ্লিষ্ট একটি মামলার সঙ্গে যুক্ত এবং আরও ১১ জন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িত ছিলেন।
পদত্যাগের ভাষণে ভুচিচ তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সময়ের মূল্যায়ন করে বলেন, তিনি দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেছেন। তবে তার শাসনামলে দুর্নীতি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা ছিল। ভুচিচ এসব অভিযোগের অনেকগুলো অস্বীকার করে আসছেন।
পররাষ্ট্রনীতিতেও ভুচিচের অবস্থান ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। তিনি সার্বিয়াকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ করার কথা বললেও একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছেন এবং চীনা বিনিয়োগের জন্যও দেশটি উন্মুক্ত রেখেছেন। ফলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হলেও অক্টোবরের সংসদীয় নির্বাচন এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
ভুচিচের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা হলো। তবে তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না; বরং প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে সংসদীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন এবং ডিসেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন—দুটিই সার্বিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।