সারাবিশ্ব
ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ট্রাম্পের, ফের ঊর্ধ্বমুখী বিশ্ববাজারে তেলের দাম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগে নতুন করে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে যুদ্ধের অবসান এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে দেওয়া প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও বেড়েছে। সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে লেনদেনের শুরু থেকেই তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে, যা বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৫৯ মিনিট, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৯৮ ডলার বা ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বেড়ে ১০৮ দশমিক ৩০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ দশমিক ৫২ ডলার বা ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ বেড়ে ৯৫ দশমিক ৯৩ ডলারে দাঁড়ায়।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরই বাজারে চাপ
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের খবর তেলের দাম বৃদ্ধিতে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। কারণ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত দ্রুত শেষ হলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কাও কিছুটা কমতে পারত।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ জলবায়ু ও পণ্যবাজার অর্থনীতিবিদ হামাদ হুসেইনের মতে, ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরই তেলের দাম বাড়তে দেখা গেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের প্রবাহ কিছুটা বাড়ায় দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ সাময়িকভাবে কমেছে। তবে সামগ্রিকভাবে বিশ্ব তেলের বাজার এখনও সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে রয়েছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি?
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই সরু নৌপথের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়। ফলে কোনো কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
ইরান এর আগে জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমালে এবং ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তেহরান কয়েকটি শর্তও সামনে এনেছিল।
কিন্তু ট্রাম্প ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিকভাবে জাহাজ চলাচল পুনরুদ্ধারের বিষয়টি আবারও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতে তেলের সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকবে, সেই ঝুঁকি হিসাব করে বাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
দীর্ঘ সংঘাতে বাড়তে পারে সরবরাহ সংকট
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সমস্যাটি শুধু হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রফতানি অবকাঠামোও সংঘাতের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। আর তেলের দাম বাড়লে এর প্রভাব সরাসরি জ্বালানি তেল, পরিবহন ও শিল্প উৎপাদনের খরচে পড়তে পারে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামও বাড়তে পারে, যা বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
এখন নজর হরমুজ ও শান্তি আলোচনায়
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক তেলবাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ও জাহাজ চলাচল কতটা স্বাভাবিক হয়। কূটনৈতিক আলোচনা আবারও গতি পায় কি না, কিংবা সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হয় কি না-তার ওপর আগামী দিনগুলোতে তেলের বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর তেলের দামে নতুন করে যে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে, তা বাজারে সরবরাহ নিয়ে বিদ্যমান উদ্বেগকেই আরও স্পষ্ট করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পরিস্থিতির প্রতিটি নতুন সিদ্ধান্ত এখন শুধু আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার, পরিবহন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।