সারাবিশ্ব

সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর পর কলকাতার ‘হোটেলপাড়া’ এখন আতঙ্কের নগরী


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৫ এএম

সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর পর কলকাতার ‘হোটেলপাড়া’ এখন আতঙ্কের নগরী
ছবি: সংগৃহীত

কলকাতার নিউমার্কেটসংলগ্ন মীর্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাত বাংলাদেশি পর্যটকের মৃত্যুর পর পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, মীর্জা গালিব স্ট্রিট ও ফ্রি-স্কুল স্ট্রিটের হোটেল ও অতিথিশালাগুলো নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠেছে।

দীর্ঘদিন ধরে নিউমার্কেটের আশপাশের এই এলাকাটি বাংলাদেশি পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ এসব হোটেল ও অতিথিশালায় অবস্থান করেন। রফি আহমেদ কিদোয়াই স্ট্রিট, লিনসে স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, কলিন লেন, মীর্জা গালিব স্ট্রিট ও এস এন ব্যানার্জি রোডজুড়ে রয়েছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল ও অতিথিশালা।

কম খরচে থাকার সুযোগ, নিউমার্কেটের কাছাকাছি অবস্থান, খাবারের দোকান, মানি এক্সচেঞ্জ এবং বাংলাদেশ ও কলকাতার মধ্যে চলাচলকারী দূরপাল্লার বাসের কাউন্টার থাকায় চিকিৎসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিদের কাছে এলাকাটি বিশেষভাবে সুবিধাজনক। বছরের পর বছর ধরে এসব সুবিধাই বাংলাদেশি পর্যটকদের এখানে টেনে এনেছে।

বাংলাদেশি পর্যটকদের চাহিদাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় অনেক বাড়ির মালিকও আবাসিক ভবন ভাড়া দিয়ে হোটেল ও অতিথিশালা গড়ে তোলার সুযোগ দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে পুরো বাড়ি কিংবা বাড়ির একটি অংশ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও একটি ভবনের বিভিন্ন তলায় পার্টিশন দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে আলাদা নামে আবাসিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক ভবনকে হোটেল বা অতিথিশালায় রূপান্তরের বিষয়টি জানা থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার নিয়ম যথাযথভাবে মানা হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। অর্থের বিনিময়ে এসব অনিয়ম উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের পর বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলের হোটেলের সামনে নিহতদের স্মরণে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি অনেক মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। একই সঙ্গে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। পৌরসভা, ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঘটনার পর হোটেল ও অতিথিশালাগুলোর বৈধতা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কথিত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে আতঙ্কে পড়েছেন হোটেল ও অতিথিশালার মালিকদের অনেকেই।

বাংলাদেশি পর্যটক সোহেল বলেন, আগে এসব হোটেলে থাকার সময় নিরাপত্তা নিয়ে এতটা ভাবতে হয়নি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনার পর তিনি জানতে পেরেছেন, মধ্যবিত্ত পর্যটকদের জন্য ব্যবহৃত অনেক হোটেল ও অতিথিশালার অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই ভয় তৈরি হয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি পাঁচতলা ভবনের বিভিন্ন অংশে আলাদা নামে একাধিক হোটেল বা অতিথিশালা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। প্লাইউড বা বোর্ড দিয়ে ছোট ছোট কক্ষ তৈরি করে আবাসিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসব স্থানে বৈধ লাইসেন্স ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

আরেক বাংলাদেশি পর্যটক মো. উজ্জ্বল খান জানান, অনেক হোটেলের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এতটাই সরু যে আগুন বা অন্য কোনো দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়া কঠিন। কোথাও জরুরি বহির্গমনের আলাদা পথ নেই। আবার কোনো কোনো ভবনে দোতলা বা তিনতলায় ওঠার জন্য লোহার সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও একটি বিদ্যুৎ সংযোগ থেকেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র, টেলিভিশনসহ একাধিক বৈদ্যুতিক যন্ত্র চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই এসব সংযোগ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন পর্যটকেরা।

মীর্জা গালিব স্ট্রিটের ব্যবসায়ী সমর দাস বলেন, এই অগ্নিকাণ্ড বাংলাদেশি পর্যটকদের মনে বড় ধরনের ভয় তৈরি করেছে। ফলে ভবিষ্যতে তারা এসব হোটেল ও অতিথিশালায় থাকতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।

অগ্নিকাণ্ডের পর অনেক বাংলাদেশি পর্যটক আতঙ্কে হোটেল ছেড়ে দ্রুত দেশে ফিরে যাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি পর্যটকদের অন্যতম আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট এলাকার হোটেলপাড়ায় এখন ব্যবসার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়েও বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।