সারাবিশ্ব

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৭ পিএম

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে বড় রদবদল
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই মাসে একঝাঁক ব্রিগেডিয়ার পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে শুরু হয়েছে বড় ধরনের রদবদল। সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদগুলোতে অভিজ্ঞ এবং ফিল্ড কমান্ডে দক্ষ কর্মকর্তাদের বসানো হচ্ছে। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী এবং গুরুত্বপূর্ণ পদাতিক ডিভিশনের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে পাকিস্তানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন করে নেতৃত্বের বিন্যাস তৈরি হচ্ছে।

এই রদবদলের সবচেয়ে আলোচিত নিয়োগগুলোর একটি হলো মেজর জেনারেল আদিল ইফতিখার ওয়ারিয়াচকে ডিরেক্টর জেনারেল অব মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স বা ডিজি এমআই হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া। এর আগে তিনি উত্তর ওয়াজিরিস্তানের মীরানশাহভিত্তিক ৭ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উত্তর ওয়াজিরিস্তান পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাউন্টার-টেররিজম এলাকা হওয়ায় সেখানে সরাসরি ফিল্ড কমান্ড পরিচালনার অভিজ্ঞতা তার নতুন দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি মেজর জেনারেল ওয়াজিদ আজিজের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। ওয়াজিদ আজিজকে পরবর্তী সময়ে ডিরেক্টর জেনারেল ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজি আইএসআই) পদে বিবেচনা করা হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।

গোয়েন্দা কাঠামোতেও এবার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আইএসআইয়ের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ডিরেক্টরেটে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাকিস্তান কোস্ট গার্ডের সাবেক ডিজি মেজর জেনারেল জাওয়াদ রিয়াজকে আইএসআইয়ের ডিজি পারসোনেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে পাকিস্তান কোস্ট গার্ডের নতুন ডিজির দায়িত্ব পেয়েছেন মেজর জেনারেল আতিফ রফিক।

এদিকে মেজর জেনারেল সাজিদ মাহমুদকে আইএসআইয়ের ‘জি ব্রাঞ্চ’-এর ডিজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই শাখার দায়িত্বের মধ্যে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপেক), ফ্রন্টিয়ার ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সময়ে সিন্ধু প্রদেশে পাকিস্তান রেঞ্জার্সের ডিজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মেজর জেনারেল মুহাম্মদ শামরিজ খানকে আইএসআইয়ের ‘এস ব্রাঞ্চ’-এর প্রধান করা হয়েছে। এই শাখা বিশেষ অভিযান ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পাকিস্তানের অন্যান্য নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।

বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত নিরাপত্তা ইস্যুতে আইএসআইয়ের বিভিন্ন শাখার সমন্বয়কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। ‘এস ব্রাঞ্চ’-এর কার্যক্রমের সঙ্গে ‘এইচ ব্রাঞ্চ’-এর সমন্বয়ের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ‘এইচ ব্রাঞ্চ’ মূলত ভারতকেন্দ্রিক নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং বর্ডার অ্যাকশন টিম (বিএটি)-সংক্রান্ত বিষয় তদারকির সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে আইএসআইয়ের এই পরিবর্তনগুলো পাকিস্তানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা নীতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বেলুচিস্তানেও সেনা কমান্ড কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা ও নিরাপত্তা সংকটে থাকা এই অঞ্চলে সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই নতুন নিয়োগগুলো করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ৯৫তম পিএমএ লং কোর্সের মেজর জেনারেল জাফর ইকবালকে ফ্রন্টিয়ার কোর সাউথ বেলুচিস্তানের ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, নতুন গঠিত ফ্রন্টিয়ার কোর ওয়েস্ট বেলুচিস্তানের প্রথম ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মেজর জেনারেল আহমেদ ফারহান। আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্তসংলগ্ন বেলুচিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই দুই কমান্ডের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আফগানিস্তান ও ইরান সীমান্ত ঘিরে পরিবর্তিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে এসব নিয়োগ পাকিস্তানের জন্য বাড়তি গুরুত্ব বহন করছে।

শুধু গোয়েন্দা ও সীমান্ত নিরাপত্তা কাঠামোতেই নয়, সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ মাঠপর্যায়ের ফরমেশনগুলোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। শিয়ালকোটে ১৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মেজর জেনারেল জিল-ই-হাসনাইন। এই নিয়োগটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ এই ফরমেশনে টানা দ্বিতীয়বারের মতো একজন আর্টিলারি অফিসারকে কমান্ড দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ওকারায় ১৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন মেজর জেনারেল ওয়াকাস কুরেশি। খারিয়ানে ১ কোরের অধীনে থাকা ১৭ পদাতিক ডিভিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মেজর জেনারেল খুররম সাবিরকে। একই সঙ্গে সেন্ট্রাল কমান্ডের চিফ অব স্টাফ হিসেবে নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন মেজর জেনারেল হাসান মেহেদী।

সব মিলিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক এই রদবদলকে শুধু নিয়মিত পদায়ন হিসেবে দেখার সুযোগ কম। গোয়েন্দা সংস্থা, সীমান্ত নিরাপত্তা, কাউন্টার-টেররিজম এবং গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ড ফরমেশন-প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ স্তরেই একসঙ্গে নেতৃত্ব পরিবর্তন করা হয়েছে। বিশেষ করে মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স, আইএসআই, বেলুচিস্তানের ফ্রন্টিয়ার কোর এবং সীমান্তসংলগ্ন পদাতিক ডিভিশনে নতুন কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়ায় পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব কাঠামোয় একটি বড় পুনর্বিন্যাসের চিত্র ফুটে উঠেছে।

তবে এসব নিয়োগের পেছনে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণ হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে কী ব্যাখ্যা দিয়েছে, তা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কর্মকর্তাদের ফিল্ড কমান্ডের অভিজ্ঞতা, গোয়েন্দা দায়িত্বে পূর্ববর্তী ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি-সব মিলিয়েই এসব পদায়নের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে হবে।