জাতীয়

আজ ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ অধ্যায়ের সমাপ্তি হওয়ার দিন


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫, ০৩:২৬ পিএম

আজ ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ অধ্যায়ের সমাপ্তি হওয়ার দিন
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ একসময় আলোচনার শীর্ষে ছিলেন তাঁর তথাকথিত ‘ভাতের হোটেল’ কার্যক্রমের জন্য। ডিবি কার্যালয়ে ডাকা বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে তিনি যেন একটি ব্যতিক্রমী ট্রেন্ড চালু করেছিলেন।

এই কর্মকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি যেমন আলোচিত হন, তেমনি সমালোচনার মুখেও পড়েন। 

সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমে এই কর্মকাণ্ডকে কেউ কেউ ‘মানবিকতা’ বললেও অনেকেই একে ‘দুষ্টুমি’ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখেছেন। হাস্যরসের মাধ্যমে ‘হারুনের ভাতের হোটেল’ নামে এর নামকরণ হয়, যা পরবর্তীতে দেশের গোয়েন্দা বাহিনীর ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।

হারুন অর রশীদ ২০২২ সালের জুলাই মাসে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ২০২৩ সালের ২৯ জুলাই বিএনপির নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনের সময় ডিবি কার্যালয়ে এনে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন তিনি। এই ভিডিওটি দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। এরপর থেকে ডিবি কার্যালয়ে বিভিন্ন অতিথিকে খাওয়ানোর ঘটনা নিয়মিত হয়ে ওঠে। অনেক তারকাকে সেখানে ডেকে এনে খাবার পরিবেশনের ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে তিনি আলোচনায় থাকতে শুরু করেন।

তবে এই ‘ভাতের হোটেল’ নিয়ে অসন্তোষও ছিল। আলোচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিরো আলম ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ডিবি কার্যালয়ে গিয়ে খাবার খেয়ে বেরিয়ে সাংবাদিকদের জানান, “আমাদের শুধু আলুভর্তা, ডাল আর ভাজি দেওয়া হয়েছে। অথচ অপু বিশ্বাস বা কোনো নেতা এলে তাদের অনেক খাবার দেওয়া হয়।” এই অভিযোগ থেকেই বোঝা যায়, ‘ভাতের হোটেল’-এ খাবারের বৈষম্য ছিল একটি বড় প্রশ্ন।

সবচেয়ে বিতর্ক তৈরি হয় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর সময়। আন্দোলনের ছয় শীর্ষ সমন্বয়কারীকে নিরাপত্তার নামে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় আটকে রাখা হয়। তাদেরকে দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণ করে প্রচার করা হয়, এবং আবারও হারুন তাদের সঙ্গে খাবার খাওয়ার ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালত তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, “জাতিকে নিয়ে মশকরা করবেন না, যাকে ধরেন তাকেই খাবার টেবিলে বসিয়ে দেন।” পরে আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোটের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সেখানেই হারুনকে গোয়েন্দা বিভাগ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত হয় এবং আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।

হারুন অর রশীদ বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি কিশোরগঞ্জ জেলার বাসিন্দা। আলোচনায় আসেন ২০১১ সালে, যখন তিনি ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। ওই সময় সংসদ ভবনের কাছে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুককে মারধরের অভিযোগ উঠে আসে তার বিরুদ্ধে।

পুলিশ সুপার হিসেবে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে হারুন একাধিক বিতর্কে জড়ান। ২০১৬ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন তাকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা মানেনি। নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ হাশেমের ছেলে ও আম্বার গ্রুপের চেয়ারম্যান শওকত আজিজ রাসেলের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে যান। রাসেলের গাড়ি ও পরিবারের সদস্যদের আটকের পর মাদক ও গুলি উদ্ধারের দাবি করলেও পরে বাসা থেকে তুলে নেওয়ার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ পেলে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ফলে ২০১৯ সালের নভেম্বরে তাকে সরিয়ে দিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়।

পরবর্তীতে ২০২১ সালে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে ডিবির উত্তর, সাইবার ও স্পেশাল ক্রাইম বিভাগে যোগ দেন এবং দ্রুতই ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে ডিবির দায়িত্ব পান। এরপর থেকেই বিতর্ক যেন তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়। হিরো আলমকে বিকৃত সুরে রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার অভিযোগে আটক করাও সমালোচনার জন্ম দেয়, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয় এবং পুলিশের উচ্চমহলেও অস্বস্তি তৈরি করে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে রাস্তায় মারধর করে ডিবি কার্যালয়ে এনে তাকে খাবার পরিবেশন করে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া হয় আরেক বড় বিতর্ক। এছাড়াও ব্লগার, টিকটকার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দিয়ে নিজের পক্ষে ভিডিও তৈরি করে প্রচারের অভিযোগও রয়েছে।

ডিবির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আলোচিত এমপি আনার হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলাতেও হারুনের প্রভাব ছিল। যারা নিয়মিত তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন না, তাদের প্রতি তিনি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতেন।

সরকারি আনুকূল্য লাভের আশায় ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের তুলে এনে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করে। সব মিলিয়ে এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আজ আনুষ্ঠানিকভাবে গোয়েন্দা বিভাগ থেকে মোহাম্মদ হারুন অর রশীদকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

৫ আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের পর শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকেই হারুন অর রশীদের আর কোনো খোঁজ মেলেনি। তবে তার ‘ভাতের হোটেল’ আর নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।