জাতীয়

ইলিশের মৌসুম শেষের পথে, আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:৫৪ পিএম

ইলিশের মৌসুম শেষের পথে, আসছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
ছবি: সংগৃহীত

রূপালী ইলিশের ঝাঁকে ঝাঁকে আসার দিন যেন পেছনে ফেলে আসছে। ভরা মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে ইলিশের দেখা নেই বললেই চলে। তার মাঝেই সরকার ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ৪ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা। এই সময়ের মধ্যে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ, এমনকি কেনাবেচাও পুরোপুরি নিষিদ্ধ থাকবে।

সরকারের মৎস্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, প্রতিবছরই পূর্ণিমা ও অমাবস্যা কেন্দ্র করে মা ইলিশ ডিম ছাড়ে। সে সময়টাকেই মূলত প্রজননের শ্রেষ্ঠ সময় ধরা হয়। সেই সময়টাকে ঘিরেই এই নিষেধাজ্ঞা। এবার ৭ অক্টোবর পূর্ণিমা পড়ায় চারদিন আগেই, অর্থাৎ ৪ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশে নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

বরিশালের উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলী সুজা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, “সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে জেলেদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। প্রশাসন, মৎস্য দপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।”

বরিশালের হিজলা উপজেলা যেখানে মেঘনার বুক চিরে ইলিশ আসার কথা সেখানে অবস্থান করা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলম বলেন, “গত বছর ১৩ অক্টোবর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা ছিল। এবার তা কিছুটা এগিয়ে এসেছে। কারণ, পূর্ণিমা একটু আগে পড়েছে।”

বরিশালের বিখ্যাত পোর্ট রোডের মোকাম ঘুরে দেখা গেছে, চলতি মৌসুমে ইলিশের আমদানি যেমন কম, তেমনি বাজারে দামও অস্বাভাবিক। মোকামের আড়তদার নাসির উদ্দিন বললেন, “আজ (শনিবার) মাত্র দেড়শ’ মন ইলিশ উঠেছে। আগের দিন ছিল আড়াইশ মন। এত কম তো অনেক বছর দেখিনি।”

তিনি জানান, বড় আকারের এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২ হাজার ১৭৫ টাকা দরে। মাঝারি (৭০০-৯০০ গ্রাম) ইলিশ ১ হাজার ৯০০ টাকা আর ছোট ইলিশ ৫০০ গ্রাম ওজনের হলে প্রতি কেজি ১ হাজার ৫০০ টাকা। গত বছরের তুলনায় এবার কেজিতে দাম বেড়েছে পাঁচ থেকে ছয়শ’ টাকা।

মেঘনার তীরের মেহেন্দীগঞ্জের জেলে তোফায়েল হোসেন নদী থেকে ফিরেই পোর্ট রোডে বসেছেন। তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট “মাছ তো এখন কিছুটা মিলতেছে। তার মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা। হাতে সময় কম। এ অবস্থায় দাদনের টাকা মেটানো কঠিন হবে।”

শুধু তোফায়েল নন, বরিশাল ও আশপাশের নদী অঞ্চলজুড়ে একই সুরে হতাশার সুর। মৌসুমজুড়েই ইলিশ তেমন একটা মেলেনি। অনেকেই বলছেন, “এই মৌসুমে এমন খালি নদী আগে দেখা যায়নি।”

মৎস্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্য সংকট, পানিপ্রবাহের ঘাটতি, অবৈধ কারেন্ট জালের দৌরাত্ম্য সব মিলে নদীতে মাছ কমে গেছে। ইলিশ তো বাদই!”

তিনি আরও বলেন, “আমরা বারবার নদীতে অভিযান চালালেও সাগরে তেমন কিছু করা যাচ্ছে না। বিদেশি ট্রলার, বাণিজ্যিক ট্রলার, ট্রলিং বোট, মুখে জাল বসিয়ে মাছ ধরা এসব নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইলিশ রক্ষা সম্ভব নয়।”

তার মতে, “বাংলাদেশে এখন মোট মাছের ৬০ ভাগই আসে সাগর থেকে, বাকি ৪০ ভাগ আসে নদী ও অন্যান্য উৎস থেকে। সাগরে নজর না দিলে নদীর ওপর নির্ভর করে টিকিয়ে রাখা যাবে না রূপালী স্বপ্নটাকে।”

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম আকন্দ বলেন, “ইলিশের আহরণ এ বছর দৃশ্যমানভাবে বাড়েনি। সেজন্য বাজারে সরবরাহও কম, ফলে দামও স্বাভাবিকভাবে বাড়তি।”

তিনি আরও বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার ইলিশ উৎপাদন আরও কম হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক অঞ্চলে মাছ কম আসছে, তা মোকামের হিসাবেই স্পষ্ট।”