জাতীয়
ব্যাংকের ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি, সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর
দেশের অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন গভর্নর মোস্তাকুর রহমান।
তিনি বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ কোটি টাকা চুরি হয়েছে এবং ঋণের এক-তৃতীয়াংশ কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। এসব ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত সম্পদও নেই। ফলে সেগুলো এখন পুরোপুরি খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও জানান গভর্নর।
সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর নুরুন নাহার, ড. হাবিবুর রহমান, মো. জাকির হোসেন চৌধুরী, ড. মো. কবির আহম্মদ এবং নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, নতুন এ তহবিলের মাধ্যমে বন্ধ কলকারখানা পুনরায় চালুর পাশাপাশি কৃষি, পোশাক, সিএমএসএমই, পরিবেশবান্ধব ও সৃজনশীল অর্থনীতির খাতে ঋণ ও অর্থায়ন দেওয়া হবে। এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গভর্নর জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আগে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও পরে তা ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে তা আরও কমে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাত চাপের মুখে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, অর্থ পাচার এবং আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। উচ্চ সুদের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও ব্যবসা সম্প্রসারণে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ এ তহবিল গঠন করা হয়েছে।
ঘোষিত প্যাকেজের মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় দেওয়া হবে। বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ২০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ১০ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার সহায়তা তহবিলে প্রি-শিপমেন্ট ক্রেডিট রিফাইন্যান্স, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, চামড়া খাত, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, হিমায়িত মাছ রপ্তানি, পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ, বিদেশে কর্মসংস্থান, স্টার্টআপ ও সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গভর্নর বলেন, সৃজনশীল অর্থনীতির জন্য বরাদ্দ ৫০০ কোটি টাকা করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে, যা ঋণ নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আশা, পুরো তহবিল কার্যকর হলে দেশে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দ তহবিল থেকে প্রায় এক লাখ মানুষের চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জানা গেছে, বেকার যুবকদের ঋণ দেওয়া হবে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে। আর গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ঋণ বিতরণ করবে আনসার-ভিডিপি ব্যাংক। এতে আনসার ও ভিডিপির সদস্যরা উপকৃত হবেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
সুদের হার প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, পুনঃঅর্থায়ন স্কিমে বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ শতাংশ সুদে অর্থ দেবে এবং ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ স্প্রেড রাখতে পারবে। ফলে বড় ঋণগ্রহীতারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ায় সুদের হার তুলনামূলক বেশি হতে পারে।