জাতীয়
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ১৮ রাষ্ট্রপতি, দায়িত্বে কে কতদিন
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতির পদে দায়িত্ব পালন করেছেন ১৮ জন। স্থায়ী, অস্থায়ী ও ভারপ্রাপ্ত—বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেয়াদে তারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর দেশ এখন নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের অপেক্ষায়। এরই মধ্যে বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ প্রার্থী হয়েছেন।
আগামী ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। তবে ব্যক্তি হিসেবে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১৮ জন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেছেন।
শেখ মুজিবুর রহমান
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হলে তিনি আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানে বন্দি থাকায় মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম কার্যত অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা জটিলতার মধ্যে ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
মুহম্মদুল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর স্পিকার মুহম্মদুল্লাহ ১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭৪ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত পদে ছিলেন।
খন্দকার মোশতাক আহমদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তবে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারান এবং ৬ নভেম্বর তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্বের অবসান ঘটে। মোট ৮১ দিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন তিনি।
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি পদত্যাগ করেন।
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জিয়াউর রহমান। পরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।
বিচারপতি আবদুস সাত্তার
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী
১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ আবদুস সাত্তারকে সরিয়ে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। প্রায় নয় মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর এরশাদ তাকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেও ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ
এরশাদের পতনের পর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
১৯৯৬ সালে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। দ্বিতীয় মেয়াদে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আব্দুর রহমান বিশ্বাস
১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে রাষ্ট্রপতি হন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।
মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদ জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০২ সালের ২১ জুন থেকে ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন।
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বও নেন। ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
মো. জিল্লুর রহমান
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর রাষ্ট্রপতি হন দলের প্রবীণ নেতা মো. জিল্লুর রহমান। ২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মো. আবদুল হামিদ
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন মো. আবদুল হামিদ। ২০১৩ সালের মার্চে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিয়মিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত মোট প্রায় ১০ বছর রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন।
মো. সাহাবুদ্দিন
আবদুল হামিদের মেয়াদ শেষে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এখন অপেক্ষা নতুন রাষ্ট্রপতির
মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর বর্তমানে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।
স্বাধীনতার ৫৫ বছরে নানা রাজনৈতিক পালাবদল, সামরিক অভ্যুত্থান, গণআন্দোলন ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে এসেছে একাধিক পরিবর্তন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরেকটি অধ্যায়।