জাতীয়

এয়ারবাসের সঙ্গে ১০ উড়োজাহাজের চুক্তি শুধু ব্যবসা নয়: ফরাসি রাষ্ট্রদূত


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

এয়ারবাসের সঙ্গে ১০ উড়োজাহাজের চুক্তি শুধু ব্যবসা নয়: ফরাসি রাষ্ট্রদূত
ছবি: সংগৃহীত

এয়ারবাস থেকে বাংলাদেশ ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাব্য চুক্তিকে শুধুমাত্র একটি বাণিজ্যিক লেনদেন হিসেবে দেখছে না ফ্রান্স। ঢাকায় নিযুক্ত ফরাসি রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেছেন, এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি হলে এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ইউরোপের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা যাবে। তবে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও এয়ারবাসের মধ্যে আলোচনা ও দরকষাকষি এখনও চলমান রয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত ‘ডিকাব টক’ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত।

এয়ারবাসের সঙ্গে সরকারের আলোচনা এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, বোয়িংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি হওয়ায় ফ্রান্স বা ইউরোপ উদ্বিগ্ন নয়। তবে এয়ারবাসসহ ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো যেন বাংলাদেশের বাজারে সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পায়, সেটি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে ফ্রান্স।

জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ওপর আমি জোর দিচ্ছি। এই বার্তাটি বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কারণ আমরা মনে করি, এটি অত্যাবশ্যকীয়। বর্তমান সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আস্থা আছে।’

এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সম্ভাব্য চুক্তির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অর্থমূল্য বা উড়োজাহাজের সংখ্যার বিচারে এটি ইউরোপের জন্য খুব বড় কোনো চুক্তি নয়। তবে এর রাজনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতে ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার বিষয়ে দেশটির আগ্রহ কতটা, এ সিদ্ধান্ত তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিতে পারে।

ফরাসি রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, ইউরোপ শুধু একটি চুক্তি করে সম্পর্ক শেষ করতে চায় না। বরং তারা বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী। ফ্রান্সের বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এয়ারবাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় তাঁর দেশ।

তিনি বলেন, ‘এটা এমন নয় যে শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ। এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়া।’

বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গুরুত্বও তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত। তিনি জানান, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রায় ১৭ শতাংশ যায় যুক্তরাষ্ট্রে, বিপরীতে ইউরোপীয় বাজারে যায় প্রায় ৪৮ শতাংশ। যুক্তরাজ্যকে হিসাবের আওতায় নিলে এই অংশ আরও বাড়ে। ফলে বাংলাদেশের জন্য ইউরোপ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে এয়ারবাস ও বোয়িং-দুই নির্মাতার সঙ্গেই দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বোয়িংয়ের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হলেও এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা বন্ধ হয়নি বলে জানান ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তাঁর দাবি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এখনও এয়ারবাসের উড়োজাহাজের বিষয়ে আগ্রহী এবং দুই পক্ষের মধ্যে দরকষাকষি ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘দরকষাকষি এখনও ভালোভাবে চলছে এবং ভালো ফলও আসছে।’

এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনার শুরু কীভাবে হয়েছিল, সে বিষয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তাঁর মতে, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কারিগরি মূল্যায়নের পর এয়ারবাসের উড়োজাহাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ ছিল না। বিশ্বের অনেক বড় বিমান সংস্থাই নিজেদের বহরে এয়ারবাস ও বোয়িং-দুই ধরনের উড়োজাহাজ ব্যবহার করে থাকে।

মিশ্র বহরের বিভিন্ন সুবিধার কথাও তুলে ধরেন জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, উড়োজাহাজের সক্ষমতা, প্রযুক্তি ও নির্দিষ্ট রুটের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন মডেল ব্যবহারের সুযোগ থাকায় একটি এয়ারলাইনসের জন্য মিশ্র বহর কার্যকর হতে পারে। এয়ারবাসের এমন উড়োজাহাজও রয়েছে, যা ঢাকা থেকে কোনো বিরতি ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূল পর্যন্ত উড়তে সক্ষম বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে এত বড় একটি চুক্তির ক্ষেত্রে সময় নিয়ে সব ধরনের কারিগরি ও বাণিজ্যিক বিষয় যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তাঁর মতে, এয়ারবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা সঠিক পথেই এগোচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ নিয়েও কথা বলেন জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে। তিনি বলেন, ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে ইইউর বাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। বাংলাদেশও যদি ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণ করতে চায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় এগিয়ে আসতে পারে।

ফরাসি রাষ্ট্রদূতের মতে, ইইউর ২৭টি দেশের সঙ্গে এফটিএ হলে বাংলাদেশের জন্য ইউরোপের বাজারে বাণিজ্যের পরিসর আরও সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-উভয় পক্ষেরই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

বাংলাদেশকে কোনো একটি অংশীদারকে বেছে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার বিষয়টিও নাকচ করেন তিনি। জঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, ফ্রান্স বা ইউরোপ কখনও বাংলাদেশকে তাদের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের মধ্যে একজনকে বেছে নিতে বলে না। বরং বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্বের ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করাই তাদের লক্ষ্য।

তিনি বলেন, ‘ফ্রান্স এবং ইউরোপ কখনও বলে না আমাদের এবং তাদের মধ্যে একজনকে বেছে নাও। আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। অংশীদারত্ব মানে বাদ দেওয়া নয়, অন্তর্ভুক্তি।’

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের চলমান গণতান্ত্রিক সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়েও কথা বলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত। তিনি জানান, বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ার ওপর ফ্রান্স নজর রাখছে। গণমানুষের অধিকার ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়েও ফ্রান্স সরকারের কাছে নিজেদের মতামত তুলে ধরা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ডিকাব) সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু হেনা ইমরুল কায়েস।