জাতীয়

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৪ পিএম

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ প্রভাব মোকাবিলায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ দ্রুত কমানোর পাশাপাশি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, সমুদ্রের উচ্চতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বকে আরও দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকালে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের কনফারেন্স রুম-৪-এ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

তারেক রহমান বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ভয়াবহ পরিণতি বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একার পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন বৈশ্বিক সহযোগিতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব।

তিনি বলেন, বিশ্ব যত পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে, সমুদ্র তার প্রতিটি টনের প্রভাব অনুভব করছে। ফলে শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে নিঃসরণ হ্রাসের দিকেও জরুরি ভিত্তিতে মনোযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ। দেশের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে শত শত নদী প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে মিশেছে। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উপকূলীয় পরিবেশের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় ২৫ সেন্টিমিটার বেড়ে গেলে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সম্ভাব্য এই বিপর্যয় মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চল সুরক্ষায় বিনিয়োগ।

জলবায়ু সহনশীলতা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ ও মজুতের জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টার প্ল্যানের আওতায় তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সবুজ প্রবৃদ্ধির পথেও এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সবুজ শিল্পের প্রসার, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলা এবং বন, জলাভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় বিভিন্ন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সংকট মোকাবিলায় চারটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। প্রথমত, বৈশ্বিক নিঃসরণ আরও দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায়সংগতভাবে কমিয়ে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অভিযোজন কার্যক্রমের জন্য পূর্বানুমেয়, সহজলভ্য ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার আরও বাড়াতে হবে।

চতুর্থত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও নিরাপদ জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, সমুদ্র দ্রুত উচ্চতর হচ্ছে। তাই জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পদক্ষেপকেও তার চেয়ে দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও টেকসই জীবন নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ঘোষণাপত্রে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেবে। কোনো দেশ ও জনগোষ্ঠী যেন একা ‘রাইজিং টাইড’ বা ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের ভয়াবহতার মুখোমুখি না হয়, তা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৈঠক আয়োজন এবং সংশ্লিষ্ট ঘোষণাপত্র প্রণয়নে সহায়তা ও প্রচেষ্টার জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।