জাতীয়

২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা, শিখনফল ও শিশুবান্ধব শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম

২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা, শিখনফল ও শিশুবান্ধব শিক্ষায় গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শিখন চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন নিশ্চিত করা এবং বিদ্যালয়কে আরও আনন্দময় ও শিশুবান্ধব করে তুলতে শিখনফলভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে কারিকুলাম সংস্কার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক শিখনপদ্ধতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের এসব পরিকল্পনার কথা জানান। সাক্ষাৎকারে তিনি প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা, দেশব্যাপী মিড-ডে মিল কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শ্রেণিকক্ষে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ প্রাথমিক শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।

২০২৮ সালে নতুন কারিকুলাম ও শিখনপদ্ধতি

নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, শিক্ষার্থীদের বয়স, সক্ষমতা ও শিখন চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম পরিমার্জন ও উন্নয়নের কাজ শুরু করেছে সরকার। এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে বিদ্যালয়ভেদে শিখন ঘণ্টার বৈষম্য দূর করার পাশাপাশি প্রতিটি বিষয়ের পাঠদান পদ্ধতি ও শিখন উপকরণকে আরও বিজ্ঞানসম্মত, সহজবোধ্য, আকর্ষণীয় এবং বয়সোপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন শ্রেণিকক্ষে আনন্দের সঙ্গে খেলতে খেলতে পড়াশোনা করতে পারে, সে ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে চায় সরকার। প্রচলিত পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষণীয় খেলনা ও উপকরণ ব্যবহার করে শিক্ষকদের পাঠদান আরও সহজ ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিশুরা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহী হওয়ার পাশাপাশি আনন্দের মধ্য দিয়ে নতুন বিষয় শিখতে পারবে।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের বাংলা, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে মৌলিক দক্ষতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাঠদানে ডিজিটাল কনটেন্ট ও ব্যবহারিক শিখন কার্যক্রম যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা ও মেধা বিকাশে গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা হবে।

২০২৭ সালের মধ্যে দেশব্যাপী মিড-ডে মিল চালুর লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো, ঝরে পড়া রোধ এবং পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচিকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে দেশের ১৫১টি উপজেলায় এ কর্মসূচি চালু রয়েছে। অবশিষ্ট উপজেলাগুলোতেও কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিক্ষার্থীর জন্য পুষ্টিকর দুপুরের খাবার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।

খাবারের মান বজায় রাখা ও সুষ্ঠুভাবে বিতরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, মায়েদের সমন্বয়ে গঠিত ‘মাদার্স কমিটি’র মাধ্যমে খাবার গ্রহণ ও বিতরণ কার্যক্রম তদারকি করা হচ্ছে। পাশাপাশি অনিয়ম প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং করা হচ্ছে।

শিক্ষকদের জন্য ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ ও স্মার্ট ক্লাসরুম

প্রাথমিক শিক্ষায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ এবং ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এটি শুধু শিক্ষকদের মধ্যে ট্যাব বিতরণের কোনো প্রকল্প নয়; বরং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ। গুগলসহ বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় এ বিষয়ে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ব্যবস্থায় শিক্ষকদের হাতে ট্যাব তুলে দেওয়া হবে, যা পুরো ডিজিটাল ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সংযোগমাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একটি সুসংহত কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোনো শ্রেণির নির্ধারিত সিলেবাস শেষ করতে সমস্যা হচ্ছে কি না, কিংবা শিক্ষার্থীরা কোন বিষয়ে বুঝতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করা যাবে। এর ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়া এবং পাঠদানের মান উন্নত করা সহজ হবে।

এ ছাড়া দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, সেসব বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সোলার প্যানেল স্থাপন এবং ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সুবিধা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে সমন্বিত উদ্যোগ

প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন শুধু বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ কিংবা শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে প্রকৃত অর্থে কতটুকু শিখতে পারছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তিনি আরও বলেন, কাঙ্ক্ষিত সংস্কার বাস্তবায়নে কারিকুলাম, শিক্ষক, মনিটরিং, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি-এই পাঁচটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কারণ প্রাথমিক শিক্ষার প্রতিটি ক্ষেত্র একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। একটি ক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটিয়ে অন্য ক্ষেত্রগুলোকে উপেক্ষা করলে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। এ কারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

শিশুবান্ধব বিদ্যালয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন শুধু ভবন নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। শ্রেণিকক্ষ, আসবাবপত্র, শৌচাগার এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা শিশুদের বয়স ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও শিশুবান্ধব শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

এ ক্ষেত্রে নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা, পাহাড়ি অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অঞ্চলভেদে প্রয়োজন অনুযায়ী উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

নৈতিক মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটানো এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

তিনি জানান, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি শিশু নিজের বয়স, সক্ষমতা ও আগ্রহ অনুযায়ী শেখার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, আনন্দময় পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সমন্বয়ে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান আরও উন্নত করা হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে সরকার।