সারাবিশ্ব

সামরিক চাপে দমাতে না পেরে ইরানকে ঘায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:৫১ পিএম

সামরিক চাপে দমাতে না পেরে ইরানকে ঘায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশল
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের ওপর চাপ আরও জোরদার করতে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্থলসীমান্ত ও কাস্পিয়ান সাগর ব্যবহার করে অস্ত্র, দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত পণ্যের প্রবেশ ঠেকাতে বিশেষ টাস্কফোর্স ‘আয়রন গেট’ গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানের অর্থনীতি, বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও সরবরাহব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। তবে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক আইন এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে পরিকল্পনাটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সির এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কয়েক মাস ধরে নৌ অবরোধসহ বিভিন্ন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেও ইরানের বিরুদ্ধে ঘোষিত লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জন করতে পারেনি ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভর না করে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নতুন ‘আয়রন গেট’ টাস্কফোর্সকে সেই কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্সের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের টাম্পায় প্রায় ২০ জন সামরিক ও বেসামরিক সদস্য নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করবে এই বিশেষ টাস্কফোর্স। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, এর মূল উদ্দেশ্য ইরানের অস্ত্র উৎপাদন এবং সামরিক শিল্প পুনর্গঠনের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। পাশাপাশি দেশটির সামরিক সরঞ্জামের মজুত বাড়ানো, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং প্রতিরক্ষা খাতে অর্থায়নের পথ সংকুচিত করাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

এদিকে, ইরানের ওপর নৌ অবরোধের মাধ্যমে দেশটির ২৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আটকে দেওয়ার দাবি করেছে ওয়াশিংটন। নতুন টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে এবার শুধু সমুদ্রপথ নয়, ইরানের স্থলসীমান্ত দিয়ে অস্ত্র ও প্রয়োজনীয় পণ্য প্রবেশের পথেও নজরদারি বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে সামরিক ও বেসামরিক উভয় কাজে ব্যবহার করা যায়-এমন প্রযুক্তি এবং সরঞ্জামের সরবরাহ বন্ধ করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান। দেশটির সঙ্গে সাতটি দেশের স্থলসীমান্ত রয়েছে। এসব প্রতিবেশী দেশের ভূখণ্ড ও সহযোগিতা ছাড়া ইরানের সীমান্ত দিয়ে পণ্য, প্রযুক্তি কিংবা অন্যান্য সরঞ্জামের প্রবেশ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন। প্রতিবেশী দেশগুলোর নিজস্ব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কাস্পিয়ান সাগরকে কেন্দ্র করেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য আইনি জটিলতা। ২০১৮ সালে স্বাক্ষরিত কাস্পিয়ান সাগরের আইনি মর্যাদাবিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, উপকূলীয় পাঁচ দেশের বাইরে অন্য কোনো দেশের সামরিক উপস্থিতি সেখানে নিষিদ্ধ। ফলে কাস্পিয়ান সাগরকে ব্যবহার করে সরাসরি মার্কিন সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। এ কারণে ওই অঞ্চলে ইরানের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে গেলে আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অবস্থান বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি সামরিক অবরোধের পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা এবং ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা সফল হতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্র উৎপাদনের কাঁচামাল, প্রযুক্তি, যন্ত্রাংশ এবং আর্থিক লেনদেনের পথ সংকুচিত করা সম্ভব হলে ইরানের সামরিক শিল্প ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে দেশটির সব স্থলসীমান্ত ও সমুদ্রপথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত কঠিন।

সব মিলিয়ে, ‘আয়রন গেট’কে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক অবরোধের পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং বিদ্যমান সামরিক চাপের পাশাপাশি অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সরবরাহব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর একটি নতুন মার্কিন কৌশল হিসেবেই উদ্যোগটিকে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থানের কারণে এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।