সারাবিশ্ব
চীন সীমান্তের কাছে ১৩ হাজার ফুট উচ্চতায় ভারতের ভারী সামরিক বিমান অবতরণ
চীন সীমান্তবর্তী পূর্ব লাদাখের দুর্গম নিয়োমা বিমানঘাঁটিতে রেকর্ড উচ্চতায় ভারী সামরিক পরিবহন বিমান অবতরণ করিয়েছে ভারতীয় বিমানবাহিনী (আইএএফ)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ৬২৯ ফুট উচ্চতায় রাশিয়ায় তৈরি আইএল-৭৬এমডি মডেলের বিশাল আকৃতির বিমানটি সফলভাবে অবতরণ করিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে দেশটি। ভারতের দাবি, এ ধরনের ভারী পরিবহন বিমানের ক্ষেত্রে এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবতরণের ঘটনা। এই সাফল্যের ফলে চীন সীমান্তবর্তী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (এলএসি) দ্রুত সেনাসদস্য, সামরিক যানবাহন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতীয় বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (৬ নভেম্বর) নিয়োমা বিমানঘাঁটিতে আইএল-৭৬এমডি বিমানটি অবতরণ করে। পরদিন শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) অবতরণের ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করে বিষয়টি নিশ্চিত করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। প্রকাশিত পোস্টে তারা লেখে, ‘১৩ হাজার ৬২৯ ফুট। বিমান চলাচলের ইতিহাসে নতুন উচ্চতা।’ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে এই অর্জনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় বিমানবাহিনী আরও জানিয়েছে, প্রতিকূল ভৌগোলিক ও আবহাওয়াগত পরিস্থিতির মধ্যেও এত উচ্চতায় ভারী পরিবহন বিমান অবতরণ করানো তাদের উড়োজাহাজের সক্ষমতার পাশাপাশি পাইলট ও ক্রুদের দক্ষতা, নিখুঁত পরিচালনা এবং পেশাদারত্বের প্রমাণ। তাদের মতে, এই সাফল্য ভারতের কৌশলগত আকাশপথে পরিবহন সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে হিমালয়ের দুর্গম সীমান্ত এলাকায় জরুরি সামরিক প্রয়োজন মেটাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পূর্ব লাদাখে অবস্থিত নিয়োমা বিমানঘাঁটিটি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। চীনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সীমান্ত উত্তেজনার কারণে ঘাঁটিটির কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। ডেমচক এলাকা এবং প্যাংগং সো হ্রদের দক্ষিণ তীরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে সামরিক দিক থেকেও অঞ্চলটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত পরিস্থিতির পরিবর্তন কিংবা জরুরি নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েন ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে এই বিমানঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
এর আগে ভারতের লেহ ও থোইস বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন করতে হতো। তবে নিয়োমা বিমানঘাঁটি সীমান্তের তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে দ্রুত সেনাসদস্য, অস্ত্র, সামরিক যানবাহন ও প্রয়োজনীয় রসদ পাঠানো সম্ভব হবে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমিয়ে আনার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় নিয়মিত সরবরাহব্যবস্থা বজায় রাখাও সহজ হবে।
নিয়োমা বিমানঘাঁটির রানওয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ। যুদ্ধবিমান ও ভারী সামরিক পরিবহন বিমানের ওঠানামার উপযোগী করে এটি নির্মাণ করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরে বিমানঘাঁটিটি পুরোপুরি চালু করা হয়। এর মাধ্যমে সীমান্ত এলাকায় সামরিক নজরদারি, সেনা ও রসদ পরিবহন, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং আহত সেনাসদস্যদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এত বেশি উচ্চতায় বিমান অবতরণ কঠিন কেন?
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ৬২৯ ফুট উচ্চতায় ভারী পরিবহন বিমান অবতরণ করানো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। কারণ, উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের ঘনত্ব ও বায়ুচাপ কমে যায়। এতে বিমানের ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা এবং ডানা থেকে উৎপন্ন উত্তোলন শক্তি (লিফট) প্রভাবিত হয়। ফলে বিমানকে আকাশে ওড়ানো, নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিরাপদে অবতরণ করানো কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে কম ঘনত্বের বাতাসে প্রয়োজনীয় উত্তোলন শক্তি পেতে বিমানকে তুলনামূলক বেশি গতির প্রয়োজন হতে পারে। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, পরিবর্তনশীল বাতাস এবং সীমিত রানওয়ের মতো বিষয়গুলোও ঝুঁকি বাড়ায়।
এমন প্রতিকূল পরিবেশে চার ইঞ্জিনবিশিষ্ট রাশিয়ায় তৈরি আইএল-৭৬এমডি বিমানটির সফল অবতরণ ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। ‘গজরাজ’ নামেও পরিচিত এই বিমানটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর ভারী সামরিক পরিবহন বহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উড়োজাহাজ। দীর্ঘ দূরত্বে বিপুলসংখ্যক সেনাসদস্য, সামরিক যানবাহন, ভারী সরঞ্জাম এবং প্রয়োজনীয় রসদ পরিবহনে এটি ব্যবহৃত হয়। এর আগে লেহ ও থোইস বিমানঘাঁটিতেও এই মডেলের বিমান পরিচালিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে নিয়োমা বিমানঘাঁটিতে আইএল-৭৬এমডি বিমান অবতরণের এই ঘটনা ভারতের সামরিক বিমান পরিবহন সক্ষমতায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বিশেষ করে হিমালয়ের দুর্গম সীমান্তে প্রতিকূল আবহাওয়া ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির মধ্যেও সেনাবাহিনীর জন্য দ্রুত রসদ সরবরাহ, সেনা মোতায়েন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ক্ষেত্রে এই অবকাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চীন সীমান্তে ভারতের সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত যোগাযোগব্যবস্থা জোরদারের ক্ষেত্রেও নিয়োমা বিমানঘাঁটির গুরুত্ব আরও বাড়বে।