সারাবিশ্ব
গাজায় ভয়াবহ বন্যা, পানিতে তলিয়ে গেছে হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু
ভারী বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো বাতাসের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ও তাঁবু। এতে খোলা আকাশের নিচে কিংবা জরাজীর্ণ তাঁবুতে আশ্রয় নেওয়া অসংখ্য পরিবার নতুন করে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো এসব মানুষের জন্য প্রতিকূল আবহাওয়া পরিস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) উত্তর গাজার গাজা শহর থেকে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার সাংবাদিক ইব্রাহিম আল-খালিলি জানান, গাজার বহু বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি এখনো অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছেন। এসব তাঁবু ভারী বৃষ্টি ও প্রবল বাতাস মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট মজবুত নয়। সর্বশেষ ঝড়ের কারণে তাঁদের আশ্রয়স্থলগুলোর নাজুক অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ইব্রাহিম আল-খালিলির ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি ও তীব্র বাতাসে অনেক তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেসব আশ্রয়কেন্দ্র মজবুত করতে পরিবারগুলো দিনের পর দিন পরিশ্রম করেছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই ঝড়ে তছনছ হয়ে গেছে। বৃষ্টির পানিতে বিছানা, বালিশ, কাপড়চোপড়সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ভিজে নষ্ট হয়েছে। এতে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রায় চার লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি এমন সব এলাকায় আশ্রয় নিয়েছেন, যেগুলো নতুন করে বন্যার কবলে পড়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাত থেকে উপত্যকাজুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত ও তীব্র বাতাস শুরু হয়। এতে প্রায় ৭০ হাজার তাঁবু বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে দেয়াল ধসে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, অবকাঠামো ধ্বংস এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়ব্যবস্থার অভাবে আগে থেকেই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে থাকা গাজাবাসীর জন্য এই দুর্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর মধ্যেই ত্রাণ সরবরাহের ওপর ইসরায়েলের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ থেকে আলজাজিরার সাংবাদিক আশরাফ আবু আমরা জানান, বন্যায় আশ্রয়কেন্দ্র প্লাবিত হওয়া অনেক বাস্তুচ্যুত পরিবার শনিবার সকাল থেকে কোনো খাদ্যসহায়তা পায়নি। ফলে আশ্রয়হীনতার পাশাপাশি খাদ্যসংকটও তাঁদের দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিয়েছে। ফিলিস্তিনে ইউনিসেফের বিশেষ প্রতিনিধি জোনাথন ভিচ জানিয়েছেন, গাজার অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত শোচনীয় ও অনিরাপদ পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পাশাপাশি আরও অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ঝড়ে প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে, ত্রাণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই গাজায় প্রয়োজনীয় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে নানা বাধার মুখে পড়ছে। গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ঝড় ও বন্যার পর তারা অন্তত ১ হাজার ৫০০টি জরুরি সহায়তার কল পেয়েছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, উপত্যকার ২ হাজারেরও বেশি ভবন যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। এ ছাড়া দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ৩ লাখ নতুন তাঁবু প্রয়োজন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ গাজার আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পাশাপাশি ত্রাণ, আশ্রয়সামগ্রী এবং পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। ফলে বৃষ্টি ও ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতাও হারিয়েছে উপত্যকাটির বড় একটি অংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় ৭৪ হাজার ৬৪০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এদিকে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ৬১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও প্রাণহানি ও অব্যাহত মানবিক সংকটের মধ্যে নতুন করে বন্যার আঘাত গাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।