ধর্ম
অভিশপ্ত বৃক্ষ জাক্কুম: যার ফল হবে জাহান্নামবাসীর খাদ্য
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে জাহান্নামবাসীদের খাদ্য হিসেবে এক ভয়ংকর গাছের উল্লেখ করেছেন, যার নাম জাক্কুম। জাককুমের ফল শয়তানের মাথার মতো আকৃতির। আরবি জাক্কুম শব্দটি এসেছে ‘তাজাক্কুম’ থেকে, যার অর্থ ক্ষুধার তাড়নায় গোগ্রাসে গিলে খাওয়া।
তাফসিরবিদদের ব্যাখ্যানুযায়ী, জাক্কুম বৃক্ষের ফল অত্যন্ত দুর্গন্ধময়, তেতো ও ঘৃণ্য।
রাসুল (স.) জাক্কুমের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘ওই জাক্কুমের সামান্য পরিমাণ যদি জাহান্নাম থেকে পৃথিবীতে আসে তবে পৃথিবীর খাদ্য ও পানীয় তার বিষাক্ততায় বিনষ্ট হয়ে যাবে।’ (তিরমিজি: ২৫৮৫)
কুফর, অবিশ্বাস ও পাপাচারের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ভয়ংকর রকমের তিক্ত-বিস্বাদ ও কুৎসিত জাক্কুম ফল জাহান্নামিদের খেতে দেওয়া হবে। প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালায় তারা তা গোগ্রাসে গিলবে এবং শাস্তির ভয়াবহতায় ফেঁসে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,
﴿إِنَّ شَجَرَتَ ٱلزَّقُّومِ ٤٣ طَعَامُ ٱلۡأَثِيمِ ٤٤ كَٱلۡمُهۡلِ يَغۡلِي فِي ٱلۡبُطُونِ ٤٥ كَغَلۡيِ ٱلۡحَمِيمِ ٤٦ خُذُوهُ فَٱعۡتِلُوهُ إِلَىٰ سَوَآءِ ٱلۡجَحِيمِ ٤٧ ثُمَّ صُبُّواْ فَوۡقَ رَأۡسِهِۦ مِنۡ عَذَابِ ٱلۡحَمِيمِ ٤٨ ذُقۡ إِنَّكَ أَنتَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡكَرِيمُ ٤٩ إِنَّ هَٰذَا مَا كُنتُم بِهِۦ تَمۡتَرُونَ ٥٠﴾ [الدخان: ٤٣، ٥٠]
“নিশ্চয় যাক্কুম বৃক্ষ পাপীর খাদ্য; গলিত তামার মতো, উদরসমূহে ফুটতে থাকবে। ফুটন্ত পানির মতো (বলা হবে) ওকে ধর, অতঃপর তাকে জাহান্নামের মধ্যস্থলে টেনে নিয়ে যাও। তারপর তার মাথার উপর ফুটন্ত পানির আযাব ঢেলে দাও। (বলা হবে) তুমি আস্বাদন কর, নিশ্চয় তুমিই সম্মানিত, অভিজাত। নিশ্চয় এটা তা-ই যে বিষয়ে তোমরা সন্দেহ করতে”। [সূরা আদ দুখান, আয়াত: ৪৩-৫০]
﴿ أَذَٰلِكَ خَيۡرٞ نُّزُلًا أَمۡ شَجَرَةُ ٱلزَّقُّومِ ٦٢ إِنَّا جَعَلۡنَٰهَا فِتۡنَةٗ لِّلظَّٰلِمِينَ ٦٣ إِنَّهَا شَجَرَةٞ تَخۡرُجُ فِيٓ أَصۡلِ ٱلۡجَحِيمِ ٦٤ طَلۡعُهَا كَأَنَّهُۥ رُءُوسُ ٱلشَّيَٰطِينِ ٦٥ فَإِنَّهُمۡ لَأٓكِلُونَ مِنۡهَا فَمَالُِٔونَ مِنۡهَا ٱلۡبُطُونَ ٦٦ ثُمَّ إِنَّ لَهُمۡ عَلَيۡهَا لَشَوۡبٗا مِّنۡ حَمِيمٖ ٦٧ ثُمَّ إِنَّ مَرۡجِعَهُمۡ لَإِلَى ٱلۡجَحِيمِ ٦٨ إِنَّهُمۡ أَلۡفَوۡاْ ءَابَآءَهُمۡ ضَآلِّينَ ٦٩ فَهُمۡ عَلَىٰٓ ءَاثَٰرِهِمۡ يُهۡرَعُونَ ٧٠﴾ [الصافات: ٦٢، ٧٠]
“আপ্যায়নের জন্য এগুলো উত্তম না যাক্কুম বৃক্ষ, নিশ্চয় আমি তাকে যালিমদের জন্য করে দিয়েছি পরীক্ষা। নিশ্চয় এ গাছটি জাহান্নামের তলদেশ থেকে বের হয়। এর ফল যেন শয়তানের মাথা, নিশ্চয় তারা তা থেকে খাবে এবং তা দিয়ে পেট ভর্তি করবে। তদুপরি তাদের জন্য থাকবে ফুটন্ত পানির মিশ্রণ। তারপর তাদের প্রত্যাবর্তন হবে জাহান্নামের আগুনে। নিশ্চয় এরা নিজদের পিতৃপুরুষদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছিল, ফলে তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণে দ্রুত ছুটেছে”। [সূরা আস সাফফাত, আয়াত: ৬২-৭০]
এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে:
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ আয়াতটি পাঠ করলেন:
«﴿ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِۦ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٢﴾ [ال عمران: ١٠٢] قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَوْ أَنَّ قَطْرَةً مِنَ الزَّقُّومِ قُطِرَتْ فِي دَارِ الدُّنْيَا لَأَفْسَدَتْ عَلَى أَهْلِ الدُّنْيَا مَعَايِشَهُمْ، فَكَيْفَ بِمَنْ يَكُونُ طَعَامَهُ؟»
“তোমরা আল্লাহ-কে যথাযথ ভয় করো আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। এরপর তিনি বললেন, যদি যাক্কুম বৃক্ষ থেকে একটি ফোটা পৃথিবীতে পতিত হয়, তাহলে তা পৃথিবীবাসীর সব জীবনোপকরণ নষ্ট করে দিবে। অতএব যে তা খাবে তার অবস্থা কী হবে?”[1]
পৃথিবীতে জাক্কুমের অস্তিত্ব আছে?
পৃথিবীতে জাক্কুম বৃক্ষের অস্তিত্ব আছে কি নেই, তা নিয়ে মুফাসসিরদের দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। এক দল বলে, কোরআনে বর্ণিত জাক্কুম আরবের এক প্রকার কাঁটাযুক্ত বৃক্ষ, যা তিহামা অঞ্চলে রয়েছে। অন্যান্য অনুর্বর অঞ্চলেও তা উৎপন্ন হয়। আরেক দল বলে, এটি জাহান্নামেরই বৃক্ষ, দুনিয়ার কোনো বৃক্ষের সঙ্গে এটিকে মেলানো ঠিক হবে না।
এ বিতর্কের অবসানে মুফতি শফি (রহ.) বলেন, ‘পৃথিবীতে যেমন সাপ-বিচ্ছু রয়েছে, তেমনি জাহান্নামেও তা থাকবে। তবে জাহান্নামের সাপ-বিচ্ছু দুনিয়ার সাপ-বিচ্ছু অপেক্ষা বহুগুণে ভয়ংকর হবে। ঠিক তেমনিভাবে জাহান্নামের জাক্কুম প্রজাতি হিসেবে দুনিয়ার জাক্কুমের মতো হলেও তা দুনিয়ার জাক্কুম অপেক্ষা অনেক বেশি কদাকার ও তিক্ত-বিস্বাদ হবে।’ (মাআরিফুল কোরআন : ৭/৪২৯)
জাক্কুম বৃক্ষের এই বর্ণনা মুমিনদের জন্য একটি গভীর শিক্ষণীয় বিষয়। আমাদের উচিত জাহান্নামের এই ভয়াবহ শাস্তি থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়া এবং যেকোনো ধরনের গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনমূলক কাজ থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকা। মহান আল্লাহ আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত দান করুন। আমিন।