সারাদেশ
যশোর-১ আসনে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী নুরুজ্জামান লিটন
একাধিক প্রার্থীর আলোচনা ও তৃণমূল পর্যায়ের চাপ সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত যশোর-১ (শার্শা) আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলেন শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ নুরুজ্জামান লিটন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি মনোনয়ন নয় বরং দীর্ঘদিনের ত্যাগী রাজনীতির স্বীকৃতি। তাই এখন শার্শা থেকে রাজধানী সবখানেই উচ্চারিত হচ্ছে একটাই কথা, নুরুজ্জামান লিটনই শেষ হাসিটা হাসলো।
বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্বাক্ষরিত আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে নুরুজ্জামান লিটনকে যশোর-১ আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির এবং মনোনীত প্রার্থী নিজে। এর আগে এই আসনে একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দলীয় হাইকমান্ড তৃণমূলের মতামত, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ত্যাগের ইতিহাস মূল্যায়ন করেই নুরুজ্জামান লিটনের নাম চূড়ান্ত করে।
দলের নেতারা বলছেন, লিটনের বড় শক্তি হলো তিনি কাগুজে নেতা নন, মাঠের রাজনীতির মানুষ। আন্দোলন-সংগ্রাম, কর্মসূচি বাস্তবায়ন, নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অগ্রভাগে। বিগত এক দশকে বিএনপি যখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করেছে, তখন নুরুজ্জামান লিটন শার্শায় দলের হাল ধরেছিলেন। মামলা, গ্রেপ্তার আতঙ্ক, রাজনৈতিক চাপ সবকিছুর মাঝেও তিনি রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। অনেক নেতাকর্মী যখন এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তখনও তিনি সংগঠন টিকিয়ে রাখতে নিরলস কাজ করেছেন।
উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা খায়রুজ্জামান মধু বলেন, লিটন শুধু নেতৃত্ব দেননি, তিনি নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন। অনেক সময় ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে তিনি কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এটাই তাকে আলাদা করেছে।
নুরুজ্জামান লিটনের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম বড় দিক হলো তার সাংগঠনিক দক্ষতা। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানা পর্যায়ের কমিটিগুলোকে সক্রিয় রাখতে ভূমিকা রেখেছেন। দলীয় সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে তার বিরুদ্ধে বড় কোনো সাংগঠনিক অভিযোগ নেই।
শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ও ত্যাগের প্রশ্নে লিটন আপসহীন। সে কারণেই কেন্দ্র তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে।
শার্শাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এমন একজন প্রতিনিধি চান যিনি তাদের সমস্যাগুলো জানেন এবং ঢাকায় গিয়ে কথা বলতে পারবেন। সীমান্ত এলাকা হওয়ায় শার্শায় রয়েছে চোরাচালান, বেকারত্ব, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যা। এলাকাবাসীর ধারণা, লিটনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তা এসব বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। সাগর হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, তিনি আমাদের এখানকার মানুষ। আমাদের সমস্যা বুঝতে তার কাউকে দরকার হয় না।
মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই শার্শাজুড়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। দলীয় কার্যালয়গুলোতে মিছিল-মিটিং এবং শুভেচ্ছা বিনিময় চলছে। অনেকের বিশ্বাস, ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা হলে এই আসনে বিএনপি বড় ব্যবধানে জয় পাবে। এক তরুণ কর্মী মারুফ হোসেন বলেন, লিটন ভাই আমাদের প্রার্থী এই গর্ব থেকেই আমরা মাঠে নামবো।
মনোনয়ন প্রসঙ্গে নুরুজ্জামান লিটন বলেন, এই মনোনয়ন আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি শার্শার ত্যাগী নেতাকর্মীদের অর্জন। আমি যদি নির্বাচিত হই, তাহলে শার্শার মানুষের অধিকার আদায়ে আপসহীন থাকবো। তিনি আরও বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে বিজয় নিশ্চিত।
মনোনয়ন চূড়ান্ত ঘোষণার পর শার্শার রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। মনোনয়ন পরিবর্তনের খবরে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তির অনুসারীদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা দিলেও নুরুজ্জামান লিটনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। অনেক এলাকায় মিছিল, শুভেচ্ছা বিনিময় ও দলীয় কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি বেড়ে যায়।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে যশোর-১ (শার্শা) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন মফিকুল হাসান তৃপ্তি। প্রায় দেড় মাস ধরে তিনি এলাকায় নিয়মিত অবস্থান করে সভা-সমাবেশ, নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন। তবে তৃণমূলের মতামত, সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং সার্বিক রাজনৈতিক বিবেচনায় শেষ মুহূর্তে দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে তৃপ্তির পরিবর্তে নুরুজ্জামান লিটনকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে জেলা বিএনপির একাধিক নেতা জানান, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় একাধিক যোগ্য প্রার্থীর নাম বিবেচনায় ছিল। এই আসনে নুরুজ্জামান লিটনের পাশাপাশি শার্শা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল হাসান জহির এবং উপজেলা বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা খায়রুজ্জামান মধুও মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তবে দীর্ঘদিনের ত্যাগ, সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ও তৃণমূল পর্যায়ের জনসমর্থনের দিকটি গুরুত্ব দিয়ে শেষ পর্যন্ত নুরুজ্জামান লিটনের নাম চূড়ান্ত করা হয়।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, প্রাথমিক ও চূড়ান্ত মনোনয়নের মধ্যে পার্থক্য থাকতেই পারে। এটি দলের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। যারা মনোনয়ন পাননি, তারাও দলের পরীক্ষিত নেতা। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লিটনের পক্ষে কাজ করতে হবে।
জেলা বিএনপির নেতারা আরও জানান, মনোনয়ন পরিবর্তন নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখে সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের এক কাতারে এসে নির্বাচনী কার্যক্রমে অংশ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।