সারাদেশ

কুড়িগ্রামে আবারও বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কায় তীরবর্তী মানুষ


সারাদেশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০২ পিএম

কুড়িগ্রামে আবারও বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার শঙ্কায় তীরবর্তী মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

কুড়িগ্রামে গত দুই দিন ধরে উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বৃষ্টির কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারসহ জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এর মধ্যে তিস্তা নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। অন্যান্য নদ-নদীর পানিও অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কৃষকেরা তাদের ফসল নিয়ে পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সময়ে দুধকুমার নদের পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি বেড়েছে ৪১ সেন্টিমিটার। ধরলা নদীর শিমুলবাড়ী পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার এবং সেতু পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। এসব নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি প্রবেশের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইতোমধ্যে তিস্তা নদীর চর ও দ্বীপচরের কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। কোথাও কোথাও বসতবাড়ি ও ফসলি জমিতে পানি উঠেছে। পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি নদীতে স্রোতের তীব্রতাও বেড়েছে। এতে নদীভাঙনও দেখা দিয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রাজারহাট উপজেলার ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট বাজারসংলগ্ন তিস্তা নদীর চর ও দ্বীপচরের নিম্নাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। এসব এলাকার অনেক বাড়িঘর ও কৃষিজমিতে পানি উঠেছে। তিস্তার চরাঞ্চলের অধিকাংশ বীজ বাদাম ও আমন ধানের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকেরা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।

ঘড়িয়ালডাঙ্গা ইউনিয়নের বুড়িরহাট বাজার এলাকার কৃষক আবু বকর বলেন, ‘একদিকে নদীর পানি বেড়ে আমন ধানের খেত তলিয়ে গেছে, অন্যদিকে নদীভাঙনও শুরু হয়েছে। এখন আর কোনো উপায় না থাকায় আধাপাকা ও কাঁচা আমন ধান কেটে বাড়িতে নিয়ে আসছি। ধান পুরোপুরি পাকলে যে ফলন পাওয়া যেত, এখন তার আগেই কেটে নিতে হচ্ছে।’

তিস্তা নদীর পাড়ের পুব বুড়িরহাট এলাকার কৃষক নাইমুদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এবার শেষ। এবার নিয়ে তিনবার বন্যা হলো। বর্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সামান্য বৃষ্টি হলেই ভারত থেকে পানি ছেড়ে দিলে আবার বন্যা দেখা দেয়। এবার বীজের জন্য যে বাদাম চাষ করেছিলাম, সেগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। আমন ধানও এখনও পুরোপুরি পাকার সময় হয়নি। বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কেটে বাড়িতে নিতে হচ্ছে। পানি না কমলে সব শেষ হয়ে যাবে।’

এদিকে তিস্তার পাশাপাশি ধরলা, দুধকুমারসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারাও নতুন করে বন্যার আশঙ্কায় রয়েছেন। কৃষক ও সাধারণ মানুষ এখন উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, পানি আরও বাড়লে নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

নদী তীরবর্তী বাসিন্দারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম প্রায় শেষ হওয়ার পরও নদ-নদীর পানি বাড়ায় তারা বিপাকে পড়েছেন। চলতি মৌসুমে কয়েক দফা বন্যা ও পানি বৃদ্ধির কারণে কৃষকদের অনেকেই ইতোমধ্যে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। নতুন করে পানি বাড়তে থাকায় আমন ধানসহ অন্যান্য ফসল রক্ষা করা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। তবে এ দফায় স্থায়ী বন্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন তিনি।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সদ্য যোগদান করা উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবীর বলেন, জেলার নদ-নদীগুলোর পানি বাড়ছে। তবে এখন পর্যন্ত কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে নিশ্চিত কোনো তথ্য আসেনি।

নদ-নদীর পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি কী দিকে যায়, তা নিয়ে নদী তীরবর্তী মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী এক থেকে দুই দিন তিস্তা ও দুধকুমারের পানি বাড়তে পারে। ফলে নদী তীরবর্তী ও নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের পাশাপাশি কৃষকদেরও পরিস্থিতির ওপর সতর্ক নজর রাখতে হচ্ছে।