বিশেষ প্রতিবেদন

রেলওয়েতে নাবিল সিন্ডিকেট এখনো দৃশ্যমান, নীরব রেল প্রশাসন


নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬, ০১:২০ পিএম

রেলওয়েতে নাবিল সিন্ডিকেট এখনো দৃশ্যমান, নীরব রেল প্রশাসন
প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নাবিল আহসান। ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

বাংলাদেশ রেলওয়েতে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক পরিচয় বদলে সুবিধা গ্রহণ, ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ এবং রেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিতর্কিত আওয়ামী ঠিকাদার নাবিল আহসানের বিরুদ্ধে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সম্প্রতি ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি রেলওয়ের কাজ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন।

রেলওয়ে সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাবিল আহসান নিজেকে সাবেক প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর আত্মীয় (ফুফা পরিচয়) হিসেবে পরিচয় দিয়ে রেলওয়ের মেকানিক্যাল দপ্তরে প্রভাব খাটান। এই পরিচয় ব্যবহার করে নাবিল গত ১৭ বছরে কয়েকশত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

শুধু তাই নয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। নাবিল ২০২৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে আসাদুজ্জামান কামালকে ঢাকা-১২ আসনে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার ছবি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন এবং নিজেকে আরও প্রভাবশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নেই, যার নাম ব্যবহার করে বা প্রভাব খাটিয়ে নাবিল আহসান সুবিধা নেননি। রেলওয়ের অভ্যন্তরে মেকানিক্যাল দপ্তরে তার শক্তিশালী একটি আওয়ামী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে তিনি কাজ আদায় ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন।

তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই নিজের অবস্থান পাল্টে ফেলেন নাবিল আহসান। তিনি প্রথমে নিজেকে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে নির্বাচনের পরে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তাদের প্রভাব ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। বর্তমানে তিনি নিজেকে গণসংহতি আন্দোলনের নেতা ও প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকির আত্মীয় হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

nabel ahmed-6.jpg
প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নাবিল আহসান। ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সিসিএস দপ্তরের বিএনপিপন্থী ঠিকাদার ও বিএনপি নেতা তারেকসহ কিছু ঠিকাদারের প্রতিরোধের মুখে চট্টগ্রামে যেতে না পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন নাবিল আহসান। এরপর তারেককে নিয়ে ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় বানোয়াট ও মিথ্যা, সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করে এমন ভাষায় লেখা শুরু করেন নাবিল।

এরপর নাবিল ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন-রেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মানহানিকর প্রচারণা শুরু করেন। একটি ফেসবুক পেজ খুলে ধারাবাহিকভাবে রেলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অশালীন ও ভিত্তিহীন পোস্ট দিতে থাকেন তিনি, যা অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রথমে তিনি রেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (কেলোকা) সাইফুল ইসলামকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় পোস্ট করেন। সাইফুলকে বদলির পরে তার নামে পোস্ট দেওয়া বন্ধ করেন নাবিল। এরপর কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই পিডি ফকির মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান। ফকির মহিউদ্দিন বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা এবং স্বৈরাচার সরকারের সময় বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের মুখ্য সমন্বয়ক। এত দিনে প্রমোশন পেয়ে ফকির মহিউদ্দিনের এডিজি (আরএস) হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নাবিলের পছন্দের কর্মকর্তা, আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী ডিসি জশীমের স্ত্রী তাবাসসুম বিনতে ইসলাম। এই কারণে ফকির মহিউদ্দিনকে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।

পরবর্তীতে এডিজি (আরএস) আহমেদ মাহবুবকে নিয়েও একই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন নাবিল। বর্তমানে তিনি বেলাল হোসেন সরকারকে লক্ষ্য করে একই ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বেলাল হোসেন বুয়েটের সাবেক ছাত্রদলের নেতা এবং স্বৈরাচার সরকারের সময় বৈষম্যের শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের সমন্বয়ক। বেলাল হোসেন সরকারের সময় সিসিএস দপ্তরে সুবিধা করতে না পেরে নাবিল তাকেও সরানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন এবং আওয়ামী লীগের লোক বসানোর ব্যবস্থা করেন এবং সফল হন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য হলো ভয়ভীতি সৃষ্টি করে পুনরায় রেলওয়ের কাজ বাগিয়ে নেওয়া এবং নিজের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

অন্যদিকে, নাবিলের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও গুরুতর আকারে সামনে এসেছে। নাবিলের কোম্পানির নামে ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর “মেসার্স দি কসমোপলিটন করপোরেশন, ঢাকা”-এর নামে চারটি বিলের বিপরীতে অতিরিক্ত ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয় চট্টগ্রাম রেলওয়ে অর্থ বিভাগ থেকে। এই অর্থ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় রেলের অর্থ বিভাগের কিছু কর্মকর্তা ও নাবিলের যোগসাজশ ছিল বলেও দাবি উঠেছে।

এছাড়াও সিসিএস দপ্তরের একটি টেন্ডার সংক্রান্ত জালিয়াতির দুদকের মামলার আসামি হিসেবেও নাবিল আহসানের নাম উঠে এসেছে, যা তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে সাপ্লায়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক নেতা বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাবিল আহসান ও ফজলে করিম মিলে সিসিএস দপ্তর কার্যত নিয়ন্ত্রণ করত। বর্তমানে সিসিএস দপ্তরের কর্তৃপক্ষ তার অনৈতিক নির্দেশ না মানায় তিনি পুরো সিসিএস দপ্তর এবং মেকানিক্যাল বিভাগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, রেলের সিভিল ডিপার্টমেন্টে হাজার হাজার কোটি টাকার কাজ হলেও সে বিষয়ে নাবিল আহসানের কোনো বক্তব্য নেই। অথচ রেলের মোট বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ সিভিল বিভাগেই ব্যয় হয়। সেদিকে তার কোনো নজর নেই, যা তার উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, নাবিল আহসানের কর্মকাণ্ড শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে না, বরং পুরো রেলওয়ে ব্যবস্থাপনাকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এছাড়াও অনেকেই বলছেন, নাবিলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতার যোগাযোগ আছে। নাবিল আওয়ামী লীগের একজন ডোনার। তিনি আওয়ামী লীগের অনেক পলাতক নেতাকে নিয়মিত অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের জোর দাবি, নাবিল আহসানের সকল লাইসেন্স বাতিল, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও অপপ্রচারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে।