বিশেষ প্রতিবেদন
ঢাকা-রংপুর ৪ লেন প্রকল্প
পলাশবাড়ীতে জমি অধিগ্রহণে একই জমি দুইবার বিক্রি, তড়িঘড়ি করে চেক প্রদানের ঘটনায় গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুনের চিঠি জালিয়াতি
ঢাকা ও উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার সড়ক যোগাযোগ সহজ ও নিরাপদ করার লক্ষ্যে বাস্তবায়নধীন এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুন এবং জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে কানুনগো আনোয়ার হোসেনের যোগসাজশে ইতোমধ্যে অধিগ্রহণকৃত একটি জমিকে পুনরায় অধিগ্রহণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ আদায়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া দালাল চক্রের সহযোগিতায় তড়িঘড়ি করে ক্ষতিপূরণের চেক ইস্যুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সম্প্রতি ভুক্তভোগী রেখা বেগম ১৬/০৬/২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত আবেদন করেন। পরবর্তীতে ২৩/০৬/২০২৬ তারিখে অ্যাডভোকেট জুলফিকার আলীর মাধ্যমে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ (স্টে অর্ডার) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ওই আবেদন ও আদালতের আদেশ পাওয়ার পরও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল মামুনের স্বাক্ষরযুক্ত ০৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখের একটি চিঠি ভুক্তভোগী রেখা বেগমের কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে অধিকতর শুনানির জন্য ০১/০৭/২০২৬ তারিখ সকাল ১১টায় উভয় পক্ষকে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত মূল কাগজপত্রসহ তফসিলভুক্ত জমিতে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে অভিযোগকারীর দাবি, ১৬/০৬/২০২৬ তারিখে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি হওয়া চিঠির তারিখ ১৬ জুনের পরবর্তী হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তার পরিবর্তে ০৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখ ব্যবহার করা হয়েছে। অভিযোগকারীর ভাষ্য, অতিরিক্ত লাভের আশায় আল মামুনের মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না। তাই তিনি ওই চিঠির সূত্র উল্লেখ করে জুন বা জুলাই মাসে চিঠি ইস্যু না করে পিছনের অর্থাৎ এপ্রিল মাসের তারিখ দিয়ে চিঠি ইস্যুর মতো উদ্ভট কাণ্ড ঘটিয়েছেন। অভিযোগকারীর মতে, তাঁর এই উদ্ভট চিঠিকাণ্ডের জন্য কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুসারে গুরুদণ্ড প্রদান করা যেতে পারে।
অভিযোগকারীর দাবি, আবেদন এবং হাইকোর্টের আদেশের পর পূর্বের তারিখ ব্যবহার করে (ব্যাকডেটে) চিঠি ইস্যু করা একটি গুরুতর অনিয়ম। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মুনছুর আলীকে সুবিধা পাইয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে এডিসি (রাজস্ব) আল মামুনসহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, ৫ আগস্টের পর ‘আ/ওয়া/মী লী/গ আবার ফিরবে’—এমন মন্তব্যের জেরে আল মামুনকে ফরিদপুর থেকে গাইবান্ধায় বদলি করা হয়েছিল।
এদিকে,সড়ক বিভাগ গাইবান্ধার নির্বাহী প্রকৌশলী জনাব পিয়াস কুমার সেন স্বাক্ষরিত এক প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করা হয় যে, এলএ কেস নং-১/৬৯/১৯৫৭-৫৮ এর আওতায় পলাশবাড়ী উপজেলার মৌজা নুনিয়াগাড়ী, জে.এল নং-৬, সিএস খতিয়ান নং-১৬, সাবেক দাগ নং-৭৯ ও ৮০ (বর্তমান দাগ-৮৩১) থেকে মোট ০.৩২ একর (৩২ শতক) জমি ১৯৫৭-৫৮ সালে প্রথম অধিগ্রহণ করা হয়।
এই জমির ক্ষতিপূরণ তৎকালীন মালিক মোফাজ্জল হোসেন (পিতা: আব্দুল শেখ) ফরম নং-১৩ এর মাধ্যমে উত্তোলন করেন। ফলে উক্ত জমির মালিকানা সরকারের অধীনে চলে যায়।
অভিযোগ রয়েছে, অধিগ্রহণের কিছুদিন পর মোফাজ্জল হোসেনের ছেলে মুনছুর আলী ওই সরকারি জমির একটি বড় অংশ পুনরায় অবৈধভাবে দখল করে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে এক্সপ্রেসওয়ের ৬ লেন প্রশস্তকরণ কাজ শুরু হলে মুনছুর আলী জেলা প্রশাসনের এলএ শাখার কানুনগো আনোয়ার ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে অবৈধভাবে নির্মিত ভবনের ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ২.৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেন, যার সত্যতা পাওয়া গেছে।
এখন পুনরায় অধিগ্রহণ দেখিয়ে আবার ১৫ কোটি টাকা আত্মসাতের চেষ্টা করছে এই চক্র।
তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫৭-৫৮ সালে মোট ১২৭ শতাংশ জমির মধ্য হতে ৩২ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ হওয়ার পর ওই একই দাগে অর্থাৎ সাবেক দাগ নং-৭৯ ও ৮০ (বর্তমান দাগ-৮৩১) থেকে ধারা ৮ এর ৩(ক) উপধারা অনুযায়ী এলএ কেস নং-১১/২০১৯-২০, জারি নং-৫৯৪৪ (তারিখ: ৩১ জুলাই ২০২৩) এর মাধ্যমে মুনছুর আলী ও তাঁর দুই ভাইয়ের নামে মোট ৩৩.২৫ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ দেখানো হয়। এতে দুই দফায় মোট ৬৫.২৫ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সেই হিসাবে কাগজপত্র অনুযায়ী মো. মুনছুর ও তাঁর ভাই-বোনের নামে জমি অবশিষ্ট থাকে ৬২ শতাংশ। কিন্তু তাঁরা ভোগদখল করছেন প্রায় ৭৫ শতাংশ। তাঁরা এই অতিরিক্ত জমি তথ্য গোপন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে সরকারের কাছে দুবার বিক্রি করেন।
পাশাপাশি তদন্তে আরও উঠে আসে, উক্ত জমির মধ্যে রেখা বেগম ও তাঁর মা-সহ ৫ বোনের জমি এবং উক্ত জমিতে নির্মিত বিল্ডিংয়ের একাংশ অন্তর্ভুক্ত হলেও তা আমলে না নিয়ে একতরফাভাবে মুনছুর আলী এই জমির মূল্য বাবদ প্রায় ১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ উত্তোলনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, জেলা প্রশাসনের কানুনগো আনোয়ার হোসেনের সিন্ডিকেট এবং জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাসহ কিছু দালাল চক্র এ কাজে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছে।
অধিগ্রহণের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বাসিন্দা রেখা বেগমের জমি ও বাড়ি অধিগ্রহণকৃত জমির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও ক্ষতিপূরণের তালিকায় নাম না থাকায় তাঁরা আপিল করেন। এর প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হয়।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের তদন্তে নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন নিশ্চিত করেন যে, ১৯৫৭-৫৮ সালে ৩২ শতক জমি অধিগ্রহণের তথ্যটি সঠিক। এর ভিত্তিতে পলাশবাড়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর নেতৃত্বে একাধিকবার জমি পরিমাপ করা হয়। এমনকি ড্রোন সার্ভের মাধ্যমেও জমি যাচাই করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সর্বশেষ পর্যায়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) বড় অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করে পূর্বের অধিগ্রহণের আংশিক তথ্য গোপন করে প্রতিবেদন দেন। পরে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে চেক ইস্যু করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অবৈধভাবে চেক ইস্যুর ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
এ বিষয়ে হাইকোর্টের এক সিনিয়র আইনজীবী বলেন, সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা জমি পুনরায় অধিগ্রহণ বা বিক্রি করা প্রতারণার শামিল। এভাবে কেউ ক্ষতিপূরণ উত্তোলন করলে তাকে অর্থ ফেরত দিতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, সরকারি জমি পুনরায় অধিগ্রহণ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের এই অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধভাবে চেক ইস্যুর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।