ক্যাম্পাস
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভুয়া সনদে চাকরি করছেন ১৮ কর্মকর্তা
অধ্যাপক ড. আব্দুল জলিল মিয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ছোট ভাই মাহবুবার রহমানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন অস্থায়ীভাবে। তার প্রভাবেই ২০১১ সালের ১৪ নভেম্বর হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগ দেওয়া হয় মাহবুবারকে।
২০১২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাহবুবার স্থায়ী নিয়োগপত্র পান। ২০১৮ সালের ২৪ জুন পদোন্নতি পেয়ে হন সহকারী রেজিস্ট্রার। ২০২৩ সালের ২ এপ্রিল আবারও পদোন্নতি পেয়ে তিনি উপ রেজিস্ট্রার হন।
২০০৯ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স পাস করেছেন বলে সনদ জমা দিয়েছিলেন। বেরোবি কর্তৃপক্ষ ওই সনদপত্র যাচাইয়ের জন্য এ বছর পাঠালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা ওই সনদপত্র ইস্যুই করেনি। ধরা পড়ে, মাহবুবার ভুয়া সনদে চাকরি করছেন। শুধু মাহবুবারই নন, বেরোবিতে তার মতো ভুয়া সনদ দেখিয়ে কম হলেও ১৮ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন পদে চাকরি করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে।
ভুয়া সনদপত্রে চাকরি করার এসব তথ্য জেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শওকাত আলী নিজেই বিস্মিত। তিনি বলেন, ‘আমি বিস্মিত। এরই মধ্যে আমরা একজনকে সাময়িক বরখাস্ত করেছি।
আরো পাঁচ কর্মকর্তার বিষয়ে তথ্য পেয়ে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাঁদের সনদ ভুয়া বলে প্রমাণ মিলবে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ভুয়া সনদে চাকরি করার বিষয়ে বেরোবি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আসছেই। এ অবস্থায় গত ৪ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১৬তম সিন্ডিকেট সভায় পদোন্নতির জন্য চারজন কর্মকর্তার নথিপত্র উত্থাপন করা হলে এ নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখা হয়। জানা গেছে, এই চারজন কর্মকর্তার সনদপত্র যাচাই করতে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে বেরোবির রেজিস্ট্রার দপ্তর থেকে।
পদোন্নতি আটকে রাখা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোরকিপার রেহমান রহমান, কম্পিউটার অপারেটর (পিএ) মো. এমদাদুল হক, ক্যাটালগার মো. মাহফুজার রহমান এবং সেকশন অফিসার (গ্রেড-২) মনিরুজ্জামানের।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, সেকশন অফিসার (গ্রেড-১) শাহিদ আল মামুন ২০১০ সালে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামিক স্টাডিজে মাস্টার্স এবং সেকশন অফিসার (গ্রেড-২) আতিকুজ্জামান একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিষয়ে মাস্টার্স পাসের সনদ জমা দেন। গত মাসে যাচাইকালে তাঁদের সনদপত্রও ভুয়া প্রমাণিত হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (শরীরচর্চা) সোহেল রানা রয়্যাল ইউনিভার্সিটি থেকে ২০০৮ সালে মাস্টার্স অব বিজনেস অ্যাডমিনেস্ট্রেশন বিষয়ে পাসের যে সনদ জমা দিয়েছিলেন সেটিও ভুয়া বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি ২০১৯ সালে এই পদে স্থায়ী নিয়োগ পেয়েছিলেন। ইরিনা নাহার ২০১২ সালের ১ মার্চ ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর পদে যোগ দেন। তিনি এশিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স পাসের সনদ দিয়েছিলেন। সেটিও ভুয়া প্রমাণিত হয়েছে। তাকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
২০১১ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন আলমগীর হোসেন। তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ২০০২ সালে অনার্স এবং ২০০৩ সালে মাস্টার্স পাসের সনদপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে যাচাইকালে তা ভুয়া বলে ধরা পড়ে। ক্যাটালগার লুৎফা বেগম জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিষয়ে ডিপ্লোমা পাস করেছেন বলে ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর সনদপত্র জমা দেন।
আরেক ক্যাটালগার রাফিয়া আকতারও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে লাইব্রেরি অ্যান্ড ইনফরমেশন সায়েন্স বিষয়ে ডিপ্লোমা পাস করেছেন বলে সনদপত্র জমা দিয়েছিলেন। উভয়ের সনদপত্র যাচাই করতে গত ৪ নভেম্বর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে বেরোবি কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে, চাকরিতে যোগদানের পর প্রত্যেক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সনদ যাচাই করার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপন শাখার। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে এসব কর্মকর্তা চাকরি করে আসছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ রেজিস্ট্রার মাহবুবার রহমান বলেন, ‘আমি যখন হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে চাকরিতে যোগদান করেছি তখন ওই পদের জন্য আমার জমা দেওয়া সনদের দরকারই ছিল না। যখন পদোন্নতি পাই তখন প্রয়োজন ছিল। আমার ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল করা হয়েছিল।’ তার দেওয়া সনদ সঠিক নয় বলেও স্বীকার করেন তিনি।