রাজধানী
কারওয়ান বাজারে মুছাব্বির হত্যা: ভাড়াটে খুনি ব্যবহারের সন্দেহ!
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ধরা পড়লেও তাদের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া দুর্বৃত্তরা ভাড়াটে খুনি। কারণ, কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে মুছাব্বির সক্রিয় থাকলেও এলাকার কেউ হামলাকারীদের চিনতে পারেনি। গতকাল তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, কারওয়ান বাজার এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুছাব্বির দীর্ঘদিন ধরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সম্প্রতি তিনি হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন বলেও তাঁর স্ত্রী পুলিশকে জানিয়েছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জের ধরেই প্রতিপক্ষের কেউ ভাড়াটে খুনি দিয়ে মুছাব্বিরকে হত্যা করিয়েছে। এই সন্দেহে তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত তেজগাঁও থানা যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা আবদুর রহমানকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। তবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে ডিবি সূত্র।
গতকাল ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পাশের গলিতে আহছানউল্লা ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল অ্যান্ড ট্রেনিং (এআইটিভিইটি) পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ভবনের সামনে স্থানীয় লোকজনের ভিড়। এই ভবনের সামনেই গুলিবিদ্ধ হন মুছাব্বির ও সুফিয়ান বেপারী মাসুদ নামে আরেকজন। তবে এলাকাবাসী ও দোকানিদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে রাজি হননি।
তবে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই কারওয়ান বাজার এলাকায় চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। এই বিরোধের জের ধরেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে গত ২৯ ডিসেম্বর কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন মার্কেটে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা মানববন্ধন করলে সেখানে হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় পুলিশ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসায়ীদের ওপর হামলার মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের এলাকায় প্রভাব কমে যাওয়ার সুযোগে মুছাব্বির ওই এলাকাগুলো ‘নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন’—এমন অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনাও বাড়ছিল। পাশাপাশি ফার্মগেট এলাকায় একটি গ্যারেজ দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বিরোধ চলছিল। প্রাথমিক অনুসন্ধানে ওই ঘটনায়ও মুছাব্বিরের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা জীবননাশের হুমকির অভিযোগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই সঙ্গে হত্যার পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, “মুছাব্বিরের স্ত্রী মামলা করতে এসে জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরেই তাঁর স্বামী হত্যার হুমকি পাচ্ছিলেন। তবে কারা হুমকি দিয়েছিল, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে কিছু বলতে পারেননি। এ সংক্রান্ত কোনো জিডি বা মামলা আগে করা হয়নি।” তিনি আরও জানান, মুছাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। ঘটনাস্থল থেকে ৭.৬৫ এমএম পিস্তলের তিনটি খোসা উদ্ধার করা হয়েছে। কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, ফার্মগেটের গ্যারেজ দখল এবং রাজনৈতিক বিরোধ—এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে তদন্ত চলছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ওত পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজন দুর্বৃত্ত মুছাব্বির ও তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের গতিরোধ করে পিস্তল দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে মুছাব্বিরের ডান হাতের কনুই ও পেটের ডান পাশে গুলি লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলে সুফিয়ান বেপারী মাসুদকেও পেটের বাঁ পাশে গুলি করা হয়।
বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে তেজতুরী বাজার এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই দুর্বৃত্ত। মুছাব্বির সেখানে পৌঁছামাত্রই তারা বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন দিক থেকে গুলি চালায়। গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেও তিনি উঠে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাঁর মোবাইল ফোন পড়ে গেলে শুটাররা সেটি নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
গতকাল দুপুরে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী অংশ নেন। এর আগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। জানাজা শেষে মরদেহ কারওয়ান বাজারের গার্ডেন ভিউ এলাকার বাসভবনে নেওয়া হয়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
মুছাব্বির হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিতে স্বেচ্ছাসেবক দল আগামীকাল শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মুছাব্বিরের জানাজার আগে এই কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়।