রাজধানী

নারীদের ‘গোলাপি বাসে’ উঠছে না তেলের খরচ, প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা ভর্তুকি


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:০১ পিএম

নারীদের ‘গোলাপি বাসে’ উঠছে না তেলের খরচ, প্রতিদিন ৫০ হাজার টাকা ভর্তুকি
ছবি: সংগৃহীত

নারীদের জন্য বিশেষ বাসসেবা চালু করেও পরিচালন ব্যয় মেটাতে পারছে না বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়া দিয়ে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, চালক-শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নারী বাসসেবা চালু রাখার জন্য নিয়মিত ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।

কালবেলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিআরটিসির নারী বাসসেবায় সারা দেশে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার টাকা লোকসান হচ্ছে। এর মধ্যে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিচালন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিআরটিসির ১৯ থেকে ৩১ আগস্ট এবং ১ থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারী বাসসেবার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বরের ১২ কার্যদিবসে ১৫৮টি ট্রিপ পরিচালনা করা হয়েছে। এসব ট্রিপে মোট ১৪ হাজার ১১৬টি টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা। অন্যদিকে, আগস্টের আট কার্যদিবসে ১১৪টি ট্রিপে ৬ হাজার ৬৮৯টি টিকিট বিক্রি হয়। ওই সময়ে আয় হয়েছে ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা।

পরিচালন ব্যয়ের চিত্র বোঝাতে মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল রুটের হিসাব সামনে আনা যায়। একমুখী এই রুটের দূরত্ব প্রায় ২১ কিলোমিটার। বাসটি যাওয়া-আসা মিলিয়ে একটি ট্রিপে মোট ৪২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। প্রতি লিটার ডিজেলে বাসটি ২ থেকে আড়াই কিলোমিটার চললে একটি ট্রিপে প্রায় ১৬ দশমিক ৮ থেকে ২১ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়।

বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা হিসাবে একটি ট্রিপে শুধু জ্বালানি বাবদ খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৯৩২ থেকে ২ হাজার ৪১৫ টাকা। এর সঙ্গে প্রতি কিলোমিটারে ৭ টাকা হিসাবে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় যোগ হলে ৪২ কিলোমিটারে আরও ২৯৪ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ, একটি ট্রিপে শুধু জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২২৬ থেকে ২ হাজার ৭০৯ টাকা।

সেপ্টেম্বরের ১৫৮টি ট্রিপ একই ২১ কিলোমিটার রুট ধরে হিসাব করলে বাসগুলো মোট ৬ হাজার ৬৩৬ কিলোমিটার পথ চলেছে। এতে আনুমানিক ২ হাজার ৬৫৪ থেকে ৩ হাজার ৩১৮ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়েছে। ১১৫ টাকা লিটার হিসাবে এই ডিজেলের দাম পড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ আরও প্রায় ৪৬ হাজার ৪৫২ টাকা খরচ হয়েছে।

অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের ওই সময়ে শুধু জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৩ লাখ ৫২ হাজার থেকে ৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বিপরীতে, টিকিট বিক্রি থেকে বিআরটিসির আয় হয়েছে ২ লাখ ২ হাজার ৮ টাকা। ফলে জ্বালানি খরচের সর্বনিম্ন হিসাব ধরলেও আয়ের তুলনায় শুধু ডিজেলেই প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে। জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ—দুই খাত একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা।

এর বাইরে রয়েছে চালকের মাসিক প্রায় ৪০ হাজার টাকা বেতন, সহকারী ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন, টায়ার ও লুব্রিকেন্টের খরচ, কর, প্রশাসনিক ব্যয় এবং বাসের অবচয়। ফলে সব ধরনের পরিচালন ব্যয় যুক্ত হলে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ে।

আগস্টের হিসাবেও প্রায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। ওই মাসে ১১৪টি ট্রিপে প্রতিটি ট্রিপে ৪২ কিলোমিটার হিসাবে বাসগুলো মোট ৪ হাজার ৭৮৮ কিলোমিটার চলেছে। এতে আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ডিজেল প্রয়োজন হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ খরচ হয়েছে আরও প্রায় ৩৩ হাজার ৫১৬ টাকা। অথচ ওই সময়ে টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে মাত্র ৯৮ হাজার ৬৪৬ টাকা। অর্থাৎ, চালক ও কর্মীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় হিসাবের বাইরে রেখেও জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতেই আয়ের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার থেকে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে।

নারীদের জন্য চালু করা বিশেষ এই বাসসেবায় যাত্রীসংখ্যাও এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ৬০ আসনের একটি বাসে প্রতিটি ট্রিপে গড়ে প্রায় ২০টি আসন খালি থাকছে। ফলে যাত্রীসংখ্যা বাড়ানো গেলে টিকিট বিক্রি থেকে আয় বাড়ার সুযোগ রয়েছে। এতে পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ঘাটতিও কিছুটা কমতে পারে।

বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম বলেন, নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতেই এই সেবা চালু করা হয়েছে। তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে সেবাটির প্রয়োজনীয়তা বিচার করা হচ্ছে না। তবে নিয়মিত ভর্তুকি দেওয়ার কারণে সেবাটি পরিচালনায় করপোরেশনের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাসের সংখ্যা বাড়লে আয়ও বাড়বে এবং তখন ভর্তুকির পরিমাণ কমে আসবে। শুরুর সময়ের তুলনায় বর্তমানে ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমছে। একটি ট্রিপে অন্তত ১২০ জন যাত্রী পাওয়া গেলে আয় ও ব্যয় সমান পর্যায়ে বা ব্রেক-ইভেনে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এর চেয়ে বেশি যাত্রী পাওয়া গেলে লাভের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তবে নারী বাসসেবার যাত্রীসংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সপ্তাহে দুই দিন বাস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণ গণপরিবহনে সপ্তাহের সাত দিন বাস চলাচল করলেও বিআরটিসির নারী বাসসেবা শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ থাকে। ফলে সপ্তাহের এই দুই দিন বিশেষ এই সেবা থেকে বঞ্চিত হন নারী যাত্রীরা।

অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি পরিবহনের বাসগুলো নিয়মিত চলাচল করে। বিআরটিসির অন্যান্য বাসও শুক্রবার ও শনিবার সড়কে চলাচল করতে দেখা যায়। ফলে নারী যাত্রীদের জন্য চালু করা বিশেষ সেবায় সপ্তাহে দুই দিন বাস বন্ধ রাখার কারণে সেবার পরিধি যেমন কমছে, তেমনি সম্ভাব্য আয়ও সীমিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিআরটিসির ব্যবস্থাপক মো. নূর-ই-আলম বলেন, শুক্র ও শনিবার কর্মজীবী নারী যাত্রীর সংখ্যা কম থাকে। এ কারণে ওই দুই দিন গোলাপি বাসের চলাচল বন্ধ রাখা হচ্ছে।

গত ১৮ আগস্ট ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ বা ‘পিংক বাস’ চালু করে বিআরটিসি। প্রাথমিকভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় ১৩টি রুটে ১৪টি বাস দিয়ে এই সেবা শুরু হয়। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি, চট্টগ্রামে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি বাস রয়েছে। ঢাকার বাসগুলোর মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল বাস।

নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই বিশেষ বাসসেবা বর্তমানে যাত্রীসংখ্যা, পরিচালন ব্যয় ও ভর্তুকির ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। যাত্রীসংখ্যা বাড়ানো, ট্রিপের কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে এই সেবার আর্থিক চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।