রাজধানী

বিয়ের দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, নিথর দেহে সিঁদুর পরিয়ে স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন হবু বর


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

বিয়ের দুই সপ্তাহ আগে ডেঙ্গুতে মৃত্যু, নিথর দেহে সিঁদুর পরিয়ে স্ত্রীর মর্যাদা দিলেন হবু বর
ছবি: সংগৃহীত

আর মাত্র দুই সপ্তাহ পরই বিয়ের পিঁড়িতে বসার কথা ছিল ২৫ বছর বয়সী বৃষ্টি ঘরামির। নতুন জীবনের স্বপ্নে লাল শাড়ি, সিঁদুরসহ বিয়ের প্রয়োজনীয় সব কেনাকাটাও শেষ হয়েছিল। তবে বিয়ের আগেই ডেঙ্গু কেড়ে নিল গোপালগঞ্জের এই তরুণীর প্রাণ। মৃত্যুর পর বৃষ্টির শেষ ইচ্ছা পূরণ করতে না পারলেও তাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছেন তার হবু বর। নিথর বৃষ্টির সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে তাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন তিনি।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বৃষ্টির মৃত্যু হয়। ঢাকার শ্যামলীতে একটি ট্রমা সেন্টারে নার্স হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। প্রায় নয় মাস ধরে সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন বৃষ্টি।

রোববার ৪ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিঁদুর পরা বৃষ্টির মরদেহের একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব ঘেঁটে দেখা যায়, মৃত্যুর দিন সকালেও তিনি বি নেগেটিভ রক্তের প্রয়োজনের কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। রক্তদাতাদের সহায়তার জন্য সেখানে একটি ফোন নম্বরও দেওয়া হয়েছিল।

ওই নম্বরে যোগাযোগ করে বৃষ্টির মৃত্যুর কারণ জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বড় বোন। পরে তিনি বলেন, ‘আমার বোন আর নেই। ১৬ অক্টোবর ওর বিয়ের দিন ছিল। বিয়ের সব কেনাকাটাও শেষ হয়েছিল। ডেঙ্গু আমার বোনটাকে কেড়ে নিল।’

বৃষ্টির অসুস্থতার শেষ সময়ের কথা জানিয়ে তার বোন বলেন, শরীরের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। পরে হিট স্ট্রোকও হয়। পরিবারের সদস্যদের ধারণা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আরও আগে শুরু করা গেলে হয়তো বৃষ্টিকে বাঁচানো সম্ভব হতো।

গোপালগঞ্জ নার্সিং ইনস্টিটিউটে পড়াশোনা করা বৃষ্টির হবু বরের বাড়ি পার্শ্ববর্তী টেকেরহাট এলাকায়। মৃত্যুর পর বৃষ্টিকে সিঁদুর পরিয়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন তার বোন। তিনি জানান, ঢাকায় বৃষ্টির মৃত্যু হওয়ার পর মরদেহ বাড়িতে আনার সময় বৃষ্টির শ্বশুর ও শাশুড়িও বিয়ের জন্য কেনা জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে আসেন।

বৃষ্টির বোন বলেন, বিয়ে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্ন ও পরিকল্পনা ছিল। বোনটি পরিবারের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে নানা গল্প করতেন। তার আকস্মিক চলে যাওয়া পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের অপূরণীয় শোক হয়ে থাকবে।

নার্স হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রোগীদের প্রতিও বৃষ্টির ছিল গভীর মমতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বিভিন্ন পোস্টেও তার মানবিকতার পরিচয় পাওয়া যায়।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর দুর্ঘটনায় আহত এক কিশোরীর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন বৃষ্টি। ওই কিশোরীর প্রতি নিজের মমতার কথাও লিখেছিলেন তিনি। গুরুতর দুর্ঘটনার পর কিশোরীটি প্রাণে বেঁচে গেলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন বৃষ্টি।

ওই রোগীর সঙ্গে তার আন্তরিক সম্পর্কের কথাও তুলে ধরেছিলেন তিনি। বৃষ্টি জানিয়েছিলেন, কিশোরীটি তাকে ‘আপু’ বলে ডাকত এবং তার সঙ্গে বাড়ি যেতে অনুরোধ করত। নার্স ও রোগীর মধ্যকার এমন আন্তরিক সম্পর্ক অনেকের অজানা বলেও নিজের লেখায় উল্লেখ করেছিলেন বৃষ্টি।

বিয়ের কেনাকাটা, নতুন সংসারের স্বপ্ন আর প্রিয়জনদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, সবই প্রস্তুত ছিল বৃষ্টির। কিন্তু আকস্মিক ডেঙ্গুতে থেমে গেল তার নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন। বিয়ের নির্ধারিত সময়ের আগেই নিথর বৃষ্টির সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণের সেই মুহূর্তটি পরিবারের কাছে হয়ে থাকল অপূর্ণ এক বিয়ের গভীর বেদনাময় স্মৃতি।