অপরাধ
কে এই রেলওয়ের আনোয়ারুল ইসলাম?
আনোয়ারুল ইসলাম বাংলাদেশ রেলওয়ের আওয়ামী ঘরানার দূর্নীতিবাজ একজন কর্মকর্তা। রেলওয়েতে আওয়ামী ঘরানার যে কয়জন কর্মকর্তা আছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হিসেবেই পরিচিত তিনি। ২০২৪ এর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আওয়ামী ঘরানার মধ্যে একমাত্র তিনি নিজেকে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের সময় রেলের আওয়ামী সিন্ডিকেটের প্রধান সহযোগী ছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম। এই সিন্ডিকেট আওয়ামী সরকারের সময় বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদের নানাভাবে হয়রানি করেছে। এই সিন্ডিকেট এমন বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে সিনিয়র কর্মকর্তা ফকির মহিউদ্দিনকে বাদ দিয়ে একজন জুনিয়র মহিলা কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এদিকে আওয়ামী সরকারের সাবেক রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের সময়কালে আনোয়ারুল সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। সুজন মন্ত্রী হওয়ার দিন চট্টগ্রামের সিসিএস পাহাড়তলী দপ্তরসহ রেলের বিভিন্ন দপ্তরে প্রায় ১০ মণ মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে নিজের প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। আনোয়ারুল নিজেকে মন্ত্রীর ভাগ্নী জামাই হিসেবেও পরিচয় দিতেন। ফলে পুরস্কার হিসেবে তিনি একই সঙ্গে সরঞ্জাম বিভাগের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পান-
১. অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক।
২. সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (পূর্ব), চট্টগ্রাম।
৩. ডিসিওএস (পরিদর্শন)।
উল্লেখ্য যে, সিনিয়র পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরেও মাল না নিয়ে বা নিম্নমানের মালামাল নিয়ে সরবরাহকারীদের বিল দেওয়ার জন্য ডিসিওএস/পরিদর্শন পদটিও আগলে রাখেন তিনি। এভাবে মালামাল না নিয়ে এবং কখনো নিম্নমানের মাল নিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেন।
সাবেক রেলমন্ত্রী সুজনের ভাগিনা এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি মোঃ নাজমুল হুদা শাহ্ অ্যাপোলো ছিলেন আনোয়ারের অন্যতম বড় হাতিয়ার। অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে অ্যাপোলো আনোয়ার সিন্ডিকেটের সহায়তায় এখনও তিনি রেলে কাজ করছেন। এমনকি ওই সময় অ্যাপোলো আনোয়ারের বাসায় লুকিয়ে ছিলেন বলেও জানা যায়।
২০২৫ সালে হঠাৎ করেই সিওএস/পশ্চিম, রাজশাহীতে বদলি হওয়ার জন্য আনোয়ারুল বিভিন্ন জায়গায় তদবির শুরু করেন এবং শেষ পর্যন্ত সফল হন। এর পেছনে একটি শক্তিশালী প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরি জীবনের ১৮ বছরের বেশি সময় তিনি চট্টগ্রামে কাটিয়েছেন। এই সময়ে এক সাথে ২/৩ টি পদে চাকুরী করার সুবাদে প্রায় হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেন এবং সে টাকার সিংহভাগ বিদেশে পাচার করেন বলেও জানা যায়। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার প্রেক্ষিতে সাময়িক চাপ এড়াতে তিনি রাজশাহীতে চলে যান।
পরবর্তীতে তার সিন্ডিকেট সুবিধা করতে না পারায় হঠাৎ সিসিএস অফিসে ‘আগুনের নাটক’ সাজিয়ে তদন্তের আগেই বেলাল হোসেনকে ওএসডি করা হয় এবং আনোয়ারুল আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। তার অর্থ এবং প্রভাব এতটাই বেশি যে, রেলভবনের অদৃশ্য আওয়ামী সিন্ডিকেটকে খুব সহজেই ম্যানেজ করে অল্প সময়ের মধ্যেই বেলাল হোসেন সরকারকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।
উল্লেখ্য, বেলাল হোসেন সরকার বুয়েটে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে বুয়েট ছাত্রদলের প্যানেল থেকে হল সংসদ নির্বাচনে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আনোয়ারুল সিন্ডিকেট শুধু ক্ষমতা নয় দূর্নীতিতেও চ্যাম্পিয়ান। টেন্ডারের কাগজ জালিয়াতি মামলার দুদকের ১ নম্বর আসামি আনোয়ারুল। দুদকের মামলার এজাহারে দেখা যায়, ২০ হাজার টাকার একটি আইটেম ১২ লাখ ক্রয় করা হয়। পরে দুদকে কাগজ জমা দেওয়ার সময় চুক্তি পরিবর্তন করে জাল চুক্তি তৈরি করেন এবং ১২ লাখ টাকার জিনিস কে ৩ লাখ টাকা করে দেখিয়ে দুদকে ভূয়া কাগজ জমা দেন। কাগজে মিল না পাওয়ায় এবং জাল কাগজ জমা দেওয়ায় দুদক তাকে ১ নং আসামী করে জালয়াতির মামলা করেন।
এছাড়াও আনোয়ারুল ফাইল সাইনের পার্সেন্টেজে সন্তুষ্টি না হওয়ায় তার স্ত্রীর ভাতিজা তূর্য ও তনয় কে দিয়ে সিসিএস দপ্তরে ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন এবং সিসিএস দপ্তরের ১ নম্বর ঠিকাদার হয়ে ওঠেন। সিসিএস দপ্তরের সাবেক একজন কর্মকর্তা (অবঃ) আমাদের বলেন, আনোয়ার স্যার এডিশনাল থাকা অবস্থায় সবচেয়ে বেশি কাজ করতেন তূর্য ও তনয় এন্টারপ্রাইজ। আমাদের জোর করে ফাইলে সাইন নিত।
ঔ সময় তূর্য ও তনয় এর সকল ফাইল স্যারের বাসায় রেডি হতো, আমরা শুধু সাইন করতাম। স্যার ঔ সময় ডিসিওএস (পরিদর্শন) ও ছিলেন। মালামাল নিয়েছেন কিনা আমরা জানি না। তাছাড়া তার দুর্নীতির আর একটা বড় দিক হল তিনি একটা বড় চাহিদাপত্রকে ৫ লাখ টাকা করে ছোট ছোট ফাইল তৈরি করে কয়েক হাজার ফাইল রেডি করেন যাতে এসব ফাইল অনুমোদনের জন্য রেলভবনে না যায়। এসব ফাইল তিনি রেডি করে সিসিএস কে দিয়ে চট্টগ্রামেই অনুমোদনের ব্যবস্থা করে শত কোটি টাকা লুটপাট করেন।
এছাড়াও আনোয়ারুলের অন্যতম সহযোগী হলেন আওয়ামী ঠিকাদার নাবিল আহসান। সম্প্রতি সময়ে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় থেকে তিনি রেলওয়ের কাজ বাগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন।
রেলওয়ে সূত্র মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নাবিল আহসান নিজেকে সাবেক প্রভাবশালী নেতা আমির হোসেন আমুর আত্মীয় (ফুফা পরিচয়) হিসেবে পরিচয় দিয়ে রেলওয়ের মেকানিক্যাল দপ্তরে প্রভাব খাটান। এই পরিচয় ব্যবহার করে নাবিল গত ১৭ বছরে কয়েকশত কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে এবং এ সকল টাকার সবই তিনি কানাডায় পাচার করেন।
শুধু তাই নয়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামালের অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। নাবিল ২০২৪ সালের বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে আসাদুজ্জামান কামালকে ঢাকা-১২ আসনে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার ছবি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন।
রেলওয়ে সূত্র আরও বলে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এমন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি নেই, যার নাম ব্যবহার করে বা প্রভাব খাটিয়ে নাবিল আহসান সুবিধা নেননি। রেলওয়ের অভ্যন্তরে মেকানিক্যাল দপ্তরে তার শক্তিশালী একটা আওয়ামী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যার মাধ্যমে তিনি কাজ আদায় ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেন।
তবে ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর হঠাৎ করেই নিজের অবস্থান পাল্টে ফেলেন নাবিল আহসান। তিনি প্রথমে নিজেকে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। পরবর্তীতে নির্বাচনের পরে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে তাদের প্রভাব ব্যবহার করার চেষ্টা করেন।
এরপর নাবিল ও আনোয়ারুল মিলে ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করেন- রেল কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মানহানিকর প্রচারণা শুরু করেন। একটি ফেসবুক পেজ খুলে ধারাবাহিকভাবে রেলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে অশালীন ও ভিত্তিহীন পোস্ট দিতে থাকেন তিনি, যা অনেক ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মানসিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রথমে তিনি রেলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (কেলোকা) সাইফুল ইসলামকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় পোস্ট করেন। সাইফুলকে বদলির পরে তার নামে পোস্ট দেয়া বন্ধ করেন নাবিল। এরপর কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই পিডি ফকির মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালান। ফকির মহিউদ্দিন বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা ও সৈরাচার সরকারের সময় বৈষম্য শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের মুখ্য সমন্বয়ক। এতো দিনে প্রমোশন পেয়ে ফকির মহিউদ্দিনের এডিজি(আরএস) হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নাবিলের পছন্দের কর্মকর্তা আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালী সাবেক ডিসি জশীমের স্ত্রী তাবাসসুম বিনতে ইসলাম। তাকে এডিজি(আরএস) বানানোর জন্য এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্চেন। এই জন্য ফকির মহিউদ্দিনকে বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে এডিজি (আরএস) আহমেদ মাহবুবকে নিয়েও একই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছেন নাবিল। বর্তমানে তিনি বেলাল হোসেন সরকারকে লক্ষ্য করে একই ধরনের অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বেলাল হোসেন বুয়েটের সাবেক ছাত্রদলের নেতা ও সৈরাচার সরকারের সময় বৈষম্য শিকার হওয়া কর্মকর্তাদের সমন্বয়ক। বেলাল হোসেন সরকারের সময় সুবিধা করতে না পাড়ায় নাবিল তাকে সরিয়ে দিয়ে আওয়ামী নেতা আনোয়ারুল কে এই পদে বাসানোর ব্যবস্থা করেন এবং সফল হন।
এছাড়াও সিসিএস দপ্তরের একটি টেন্ডার সংক্রান্ত জালিয়াতির দুদকের মামলার আসামি হিসেবেও নাবিল আহসানের নাম উঠে এসেছে, যে মামলার ১ নম্বর আসামি আনোয়ারুল ইসলাম।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, নাবিল আহসানের কর্মকাণ্ড শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে না, বরং পুরো রেলওয়ে ব্যবস্থাপনাকে অস্থিতিশীল করার ঝুঁকি তৈরি করছে। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের জোর দাবি, নাবিল আহসানের সকল লাইসেন্স বাতিল, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত গ্রেফতার নিশ্চিত করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রভাব বিস্তার, অনিয়ম ও অপপ্রচারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। একই সাথে দুর্নীতিবাজ, আওয়ামী মাফিয়া কর্মকর্তা, দুদকের টেন্ডার জালিয়াতি মামলার ১ নং আসামী আনোয়ারুল কে অবিলম্বে চাকুরী থেকে স্থায়ী বরখাস্ত করে তাকে গ্রেফতারের দাবী জানানো হয়।