শিক্ষা
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অ্যাডভান্সড কোর্সে নীতিমাল অকার্যকর, অনুমোদনের রমরমা
দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা কারিগরি শিক্ষা আজ নিজেই গভীর সংকটে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরিচালিত এক বছর মেয়াদী অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেট কোর্স অনুমোদনে ব্যাপক অনিয়ম, নীতিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং পরিকল্পনাহীন সিদ্ধান্তের কারণে এই খাত ধীরে ধীরে আস্থাহীনতার দিকে এগোচ্ছে-এমন অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল থেকে।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নিজস্ব ‘প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও অনুমোদন নীতিমালা’ অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় সর্বোচ্চ দুটি এবং প্রতিটি জেলা সদরে সর্বোচ্চ তিনটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলা সদর, পৌরসভা ও শিল্প এলাকায় প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্ব বজায় রাখার বাধ্যবাধকতাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই নীতিমালা বাস্তবে কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রাজশাহী জেলার বোয়ালিয়া উপজেলায় নীতিমালা উপেক্ষা করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে। একই জেলার পবা উপজেলায় অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছয়টি, যেখানে নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদনের সীমা ছিল মাত্র দুটি। পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায় তিনটি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়াও নীতিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। প্রশ্ন উঠছে-এই অনুমোদনগুলো কীভাবে, কোন যাচাই প্রক্রিয়ায় এবং কার সুপারিশে দেওয়া হলো?
ঢাকা মহানগরীর মিরপুরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় চারটি অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেট কোর্স প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের তথ্যও সামনে এসেছে। জেলা সদর সংক্রান্ত নীতিমালাও মানা হয়নি-সাতক্ষীরা জেলা সদরে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে সর্বোচ্চ অনুমোদনের সীমা ছিল তিনটি। শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এসব সিদ্ধান্ত শুধু পরিকল্পনাহীনই নয়, বরং অনুমোদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
নীতিমালার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত, প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ন্যূনতম এক কিলোমিটার দূরত্ব-প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাতক্ষীরায় একই ঠিকানায় দুটি, খুলনায় দুটি, নরসিংদীতে দুটি, কুমিল্লায় তিনটি এবং লক্ষ্মীপুরে দুটি প্রতিষ্ঠান একই ভবন বা একই ঠিকানায় কার্যক্রম চালাচ্ছে। এতে করে একাধিক প্রতিষ্ঠান একই ল্যাব, একই যন্ত্রপাতি ও একই অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা কারিগরি শিক্ষার মৌলিক ধারণার পরিপন্থী।
এর সরাসরি ভুক্তভোগী হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। একাধিক শিক্ষার্থী জানান, একটি ল্যাবে একসঙ্গে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ক্লাস করতে হয়। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি না থাকায় সবাই হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ পান না। ফলে ব্যবহারিক শিক্ষার যে মূল লক্ষ্য-দক্ষতা অর্জন-তা কার্যত ব্যাহত হচ্ছে।
একই ঠিকানা ও একই ভবন ব্যবহার করে পরিচালিত একাধিক অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেট কোর্স প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আরও উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আসে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নথি ও ওয়েবসাইটে উল্লেখ থাকা মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও অধিকাংশ নম্বরই বন্ধ পাওয়া যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নম্বরটি সক্রিয় থাকলেও ফোন রিসিভ করা হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব অস্তিত্ব, নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিক্ষার্থী ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হয়েও যদি যোগাযোগের ন্যূনতম ব্যবস্থাটুকু কার্যকর না থাকে, তাহলে তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণ আদৌ কতটা কার্যকর হচ্ছে-সে প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
অন্যদিকে, শিক্ষার্থী সংকট এখন মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট সূত্র অনুযায়ী, সারা দেশে বর্তমানে ২৭৪টি অনুমোদিত অ্যাডভান্সড সার্টিফিকেট কোর্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এসব প্রতিষ্ঠানে মোট আসন সংখ্যা ১৬ হাজারেরও বেশি। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র আট হাজারের মতো শিক্ষার্থী। অর্থাৎ ঘোষিত আসনের প্রায় অর্ধেকই খালি রয়ে গেছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, যেখানে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোই শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে, সেখানে নতুন করে প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দেওয়া মানে সংকটকে আরও গভীর করা। এতে একদিকে উদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে কোর্সটির সামগ্রিক মান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিষ্ঠান পরিচালক অভিযোগ করে বলেন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড কার্যত কোনো মনিটরিং করছে না। তাঁর ভাষায়, বোর্ড কেবল আবেদন ফি গ্রহণ ও অনুমোদন দিতেই ব্যস্ত। আগে যেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে ৫০টি আসনের বিপরীতে ৫০ জন শিক্ষার্থী পাওয়া যেত, সেখানে এখন পাঁচজন শিক্ষার্থীও পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি বিভাগের উপসচিব ড. মো: মজিদুল হক বলেন, “নীতিমালা ফলো না করলে তো অবশ্যই সেটা অন্যায়।” তিনি আরও স্বীকার করেন যে অনুমোদনের ক্ষেত্রে যথাযথ যাচাই হয়নি। তাঁর ভাষায়, “শিক্ষা বোর্ড আগে যাকে তাকে হয়তো অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে, ভালো করে যাচাই করেনি। বোর্ড থেকেই পরিদর্শন করে আমাদের কাছে সুপারিশ পাঠানোর কথা।”
তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সরেজমিনে পরিদর্শনের মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই এবং অনুমোদনের মূল দায়িত্ব কারিগরি শিক্ষা বোর্ডেরই। নীতিমালার বাইরে কাজ হলে ব্যবস্থা নিতে বোর্ডকে নির্দেশ দেওয়া আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কারিগরি শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে পরিকল্পনাহীন অনুমোদন চলতে থাকলে কারিগরি শিক্ষা দক্ষতা তৈরির মাধ্যম না হয়ে ধীরে ধীরে সনদনির্ভর বাণিজ্যে পরিণত হবে। একজন জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞের ভাষায়, একই এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ল্যাব, প্রশিক্ষক ও অবকাঠামোর মান কোনোভাবেই ধরে রাখা সম্ভব নয়।
অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। এক অভিভাবক বলেন, ভর্তি করানোর সময় আধুনিক ল্যাব ও মানসম্মত প্রশিক্ষণের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়, একই ল্যাবে একাধিক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের ভিড়। এতে সন্তান প্রকৃত দক্ষতা অর্জন করতে পারবে কি না-সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, সচিব ও প্রতিষ্ঠান অনুমোদন কমিটির সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কেউই মন্তব্য দিতে রাজি হননি। এই নীরবতাও নতুন করে প্রশ্ন তুলছে-নীতিমালা লঙ্ঘনের দায় এড়াতেই কি এই নীরবতা?
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন এখন একটাই-যদি নীতিমালা কার্যকর করার কোনো সদিচ্ছাই না থাকে, তবে তা প্রণয়ন করা হলো কেন? আর শিক্ষার্থী সংকট ও মানহানির ঝুঁকি জেনেও কার স্বার্থে চলছে এই অনুমোদনের রমরমা?