পরিবেশ-জলবায়ু

‘গডজিলা লেভেল’ এল নিনো! আগামী ৬ মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১০ পিএম

‘গডজিলা লেভেল’ এল নিনো! আগামী ৬ মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

সুপার এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের এক পূর্বাভাস অনুযায়ী, এল নিনোর কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত তাপ আগামী ছয় মাসে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র-বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানুষের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পরিমাপকারী গবেষণা সংস্থা ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব এক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দিয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার হতে পারে। তবে এই সংখ্যা কেবল অতিরিক্ত তাপের কারণে সম্ভাব্য মৃত্যুকে নির্দেশ করছে। এল নিনোর প্রভাবে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো অন্যান্য দুর্যোগ থেকে আরও প্রাণহানি ঘটতে পারে।

গবেষণাটির জন্য ‘পিয়ার-রিভিউড’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলের মাসভিত্তিক তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সম্পর্ক শনাক্ত করা হয়। এরপর আগামী কয়েক মাসে এল নিনোর প্রভাবে সম্ভাব্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাসের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। গবেষণার ভিত্তি হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ের গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত তাপ ইতোমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে। নতুন পূর্বাভাসে সেই বিদ্যমান মৃত্যুর হিসাবের বাইরে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য অতিরিক্ত প্রাণহানির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবের সময়কাল ধরা হয়েছে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। তবে তাপজনিত মৃত্যুর প্রভাব এর পরও কয়েক মাস অব্যাহত থাকতে পারে। গবেষকদের ধারণা, জুন বা জুলাই পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপের কারণে মৃত্যুর হার বাড়তে পারে।

এবারের এল নিনো ইতোমধ্যে বিজ্ঞানীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কয়েক মাস পর এটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকলেও তার আগেই এল নিনোর ইতিহাসে রেকর্ড করা তাপমাত্রার সর্বোচ্চ সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে গবেষকেরা। অতীতের ঘটনাগুলোর তুলনায় এবারের তাপমাত্রার মাত্রা এতটাই বেশি যে বিজ্ঞানীদের কেউ কেউ পরিস্থিতিকে ‘গডজিলা লেভেল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, সম্ভাব্য ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাবটি কেবল একটি সংখ্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য পরিবারের স্বজন হারানোর সম্ভাবনা। কারও মা-বাবা, সন্তান, দাদা-দাদি কিংবা অন্য কোনো প্রিয়জন এই তালিকায় থাকতে পারেন।

এল নিনোর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। গ্রীষ্মপ্রধান ও ক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে অতিরিক্ত তাপের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে। দেশটিতে অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জনের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

গবেষকদের মতে, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এল নিনোর অতিরিক্ত তাপের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এসব অঞ্চলে উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

গবেষণা প্রতিবেদনটির সহলেখক এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির সহযোগী অধ্যাপক তাম্মা কার্লটন বলেন, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করে সেখানে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া গেলে এ বছরই অনেক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।

গবেষকেরা এজন্য উন্নত তাপমাত্রা ও তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুলিং সেন্টার স্থাপন, সবচেয়ে গরম সময়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অতিরিক্ত জনবল প্রস্তুত রাখা এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

তাম্মা কার্লটনের মতে, বর্তমানে যে চরম তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে, আগামী ২০ বছর পর সেটিই অনেক অঞ্চলে ‘নিউ নরমাল’ বা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিণত হতে পারে। তাই শুধু এবারের এল নিনো মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে এখন থেকেই জীবন রক্ষার বিভিন্ন ব্যবস্থা তৈরি, প্রয়োগ ও মূল্যায়ন করা জরুরি।