ফিচার

হাওরের হাসি ফিকে হচ্ছে: জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়ায় একদিনের ভ্রমণ


ফিচার ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৫, ০২:৫৪ পিএম

হাওরের হাসি ফিকে হচ্ছে: জলবায়ু পরিবর্তনের ছায়ায় একদিনের ভ্রমণ
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

প্রথম দেখায় সবই যেন আগের মতো। ঢেউয়ের তালে দুলছে নৌকা, চারপাশে অপার জলরাশি, হাওরের বুকজুড়ে এক অপার্থিব শান্তি। সূর্যটা যদিও আগের চেয়ে একটু বেশি উজ্জ্বল, বাতাসেও যেন উষ্ণতার ছোঁয়া, তবু হাওরের বুক ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে সে গরম ঠিক বোঝা যায় না।

আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে একদিনের ভ্রমণে বের হয়েছিলাম—নিকলি থেকে মিঠামইন হয়ে অষ্টগ্রাম। উদ্দেশ্য ছিল হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করা। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালেই ধরা দিল প্রকৃতির অসহায় পরিবর্তনের চিহ্ন।

DHAKAPROKASH- Hower's smile 1.jpg
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

ভোরে যাত্রা শুরুতেই মন ভালো করে দেয় ঠান্ডা বাতাস। কিন্তু বেলা বাড়তেই গরম আমাদেরও ক্লান্ত করে তোলে। মিঠামইনের দিকে যেতে যেতে দেখি, কয়েকজন মাঝি মাথায় ভেজা গামছা বেঁধে নৌকা ঠেলছেন। এক মাঝি বললেন, “আগে এত গরম পড়তো না। এখন তো দিনে দু’বার পানিতে না নামলে পারা যায় না।”

অষ্টগ্রামের হাটে দেখা হলো কৃষক মানিক মিয়া সঙ্গে। তাঁর কথায় আক্ষেপ, “এই বছরও ধান কম উঠেছে। সময়মতো পানি আসছে না, আবার কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টিতে সব ডুবে যাচ্ছে।”

আর জেলে হানিফ  বললেন, “মাছ ধরার দিন তো আগের মতো নেই। পানি বাড়লে মাছ ধরা যায় না, কমলে নৌকা চলে না। এখন আর কিছুই ঠিকমতো চলে না।”

এই কথাগুলো শুনে মনে হলো—এটা শুধু কিছু মানুষের কষ্টের গল্প না, বরং হাওরাঞ্চলের জীবনের অভ্যন্তরে জেঁকে বসা পরিবর্তনের এক গভীর চিত্র। জলবায়ুর প্রভাব যেন সবকিছুর ছন্দ পাল্টে দিয়েছে।

DHAKAPROKASH- Hower's smile 2.jpg
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

নিকলি ঘাটে কিছু শিশু নৌকার পাশে গোসল করছিল। কিন্তু এক মা জানালেন, “এই পানি ভালো না। এখন আর আগের মতো পরিষ্কার না থাকে, মাছও কমে গেছে। রান্নার জন্য পানি আনতেও ভয় লাগে।”
অথচ এরা পানির মধ্যে বাস করেও বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার করছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, বর্জ্য আর দূষণ পানির মানকে দ্রুত খারাপ করে দিচ্ছে।

এই ভ্রমণে চোখে পড়েছে আরও কিছু—পর্যটকদের ভিড় বেড়েছে, রিসোর্ট উঠছে, নৌকার সারি সারি ভিড়। কিন্তু স্থানীয়দের কণ্ঠে হতাশা, “অনেকেই ময়লা ফেলে যায়, পলিথিন পানির নিচে জমে থেকে মাছের ক্ষতি করে।”

পর্যটন হতে পারে হাওরের সম্ভাবনা, তবে তা যদি পরিবেশবান্ধব না হয়, তবে এই নৈসর্গিক সৌন্দর্য অনেক দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই সমস্যাগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে সমাধানের দিকেও তাকাতে হয়।

DHAKAPROKASH- Hower's smile 3.jpg
ছবি: ঢাকাপ্রকাশ

স্থানীয় কৃষকদের জন্য জলবায়ু সহনশীল বীজ ব্যবহার, টেকসই জল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন পরিকল্পনা, এবং পরিবেশ নিয়ে শিশু-কিশোরদের মাঝে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

হাওর শুধু একটা অঞ্চল নয়, এটি এক জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। জলবায়ুর ছায়া সেই অস্তিত্বকেই প্রতিনিয়ত চেপে ধরছে। আমাদের যারা বাইরে থেকে এসে এই সৌন্দর্যে মুগ্ধ হই, তাদের উচিত শুধু উপভোগ নয়—এই পরিবর্তনের গল্পগুলো বলা, বোঝা, ছড়িয়ে দেওয়া।

একদিনের ভ্রমণ আমাদের শুধু জায়গা ঘুরিয়ে দেখায়নি, চোখ খুলে দিয়েছে।
হাওরের হাসি যেন হারিয়ে না যায়—এই দায়িত্ব আমাদের সবার।

লেখক: মারুফা জাহান মুমু 
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি