ফিচার
লেইস ফিতার ডাক: এক রঙিন অপেক্ষা
একসময় গ্রামের রাস্তায় কিংবা শহরের সরু অলিতে-গলিতে হঠাৎ করেই ভেসে আসত এক ডাক—“লেইস ফিতা! লেইস ফিতা!”।
সেই ডাকেই যেন ছিল এক অদ্ভুত টান, বিশেষ করে নারীদের মনকে অস্থির করে তুলত। সাপ্তাহিক সেই আগমনের জন্য অপেক্ষায় মেয়েরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকত, ছোট্ট শিশুদের হাত টেনে নিয়ে যেত রঙিন বাক্সবন্দি ফেরিওয়ালার কাছে।
লেইস ফিতার উৎপত্তি হয়েছিল মূলত ১৯৫০–৬০ দশকে। সামাজিক প্রথা আর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তখন নারীদের বাহিরে যাওয়া ছিল এক অচিন্তনীয় ব্যাপার । ফলে তারা সহজে দোকান থেকে সাজসজ্জার জিনিস কিনতে পারতেন না। এই শূন্যস্থান থেকেই জন্ম নেয় এক বিশেষ ফেরিওয়ালা সংস্কৃতি। যারা লেইস, ফিতা, চুড়ি, রিবন, টিকলি আর প্রসাধনী নিয়ে অলিগলি ঘুরতেন, তাদেরই বলা হতো লেইস ফিতাওয়ালা।
এই নামের উৎপত্তি হয়েছিল সেই লেস আর ফিতা থেকেই, যা তাদের পসরা সাজানোর প্রধান উপকরণ ছিল। অনেকেই সাপ্তাহিক হাট থেকে মাল কিনে এনে নির্দিষ্ট রুট ধরে গ্রাম বা শহরের মহল্লায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতেন। নারীদের কাছে এটি ছিল বাজারের এক বিকল্প দরজা, আর শিশুদের কাছে রঙিন আনন্দের এক আভাস ।
লেইস ফিতাওয়ালা তাদের কাঠের বাক্স বা দড়িতে ঝুলানো সামগ্রী নিয়ে হাজির হতো। সেখানে পাওয়া যেত কাঁচের চুড়ি, রঙিন ফিতে, চুল বাঁধার ফিতা, রিবন, টিকলি, লিপস্টিক কিংবা ছোটখাটো প্রসাধনী। সবকিছু যেন এক ক্ষুদ্র জগতের মতো সাজানো থাকত। অনেকের কাছে এগুলো বিলাসবহুল কেনাকাটার বিকল্প না হলেও, তবুও ছিল হাতের নাগালে পাওয়া সৌন্দর্যের উপকরণ। এই সহজলভ্যতা তখনকার নারীদের জন্য ছিল এক ধরনের আনন্দ আর স্বাধীনতার প্রকাশ ।
লেসফিতার আগমন শুধু কেনাকাটার বিষয়ই ছিল না, বরং সেটি হয়ে উঠত এক সামাজিক ঘটনার মতো। মহল্লার নারীরা বাইরে আসতেন, একে অপরের সঙ্গে গল্প করতেন, দরদাম করতেন। যেন সেই ডাক একসঙ্গে মিলনেরও আয়োজন করে দিত। ছোট্ট এক গলিপথ মুহূর্তেই ভরে উঠত রঙিন হাসি আর কোলাহলে।
কালের স্রোতে এই দৃশ্যগুলো ধীরে ধীরে মুছে গেছে। আধুনিক শপিংমল, অনলাইন মার্কেট কিংবা কসমেটিক্সের বিশাল দোকান আজ লেইস ফিতার জায়গা দখল করেছে। এখন আর গলিতে ফেরিওয়ালার সেই উচ্ছ্বসিত ডাক শোনা যায় না। নারীদের সাপ্তাহিক প্রতীক্ষাও কোথাও মিলিয়ে গেছে। অথচ সেই অপেক্ষার মধ্যে ছিল এক ধরনের অনাবিল আনন্দ, এক সহজ-সরল সময়ের প্রতিফলন।
আজ লেইস ফিতা কেবলই এখন এক নস্টালজিয়ার অংশ। যারা সেই ডাক শুনে বড় হয়েছেন, তাদের স্মৃতির ভাঁজে এখনো রয়ে গেছে রঙিন চুড়ির ঝনঝনানি শব্দ কিংবা টিকলির ঝিলিক। এই ছোট্ট অথচ প্রাণবন্ত ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ ছিল। হয়ত আর ফিরে আসবে না, তবে ইতিহাসের পাতায় কিংবা মানুষের সুন্দর স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবে চিরকাল।
লেখক : মারুফা জাহান মুমু
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি