স্বাস্থ্য

তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, যা জানা গেল


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম

তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ, যা জানা গেল
ছবি: সংগৃহীত

কৌতূহল বা যৌনতা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা, অসচেতনতা, সুরক্ষা সামগ্রী সম্পর্কে ধারণা না থাকা ইত্যাদি কারণে তরুণ-তরুণীদের  মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ দিন দিন বাড়ছে।

মারাত্মক এ ব্যাধি সম্পর্কে সচেতনতামূলক ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ, শিক্ষায় যৌনশিক্ষার প্রসার এবং সার্বিকভাবে সচেতনতা বাড়ানো এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। 

সরকারের হিসাব বলছে, গত বছর (২০২৫) সালে অবিবাহিতদের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তের হার ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দিন দিন অবিবাহিত কিশোর বা তরুণদের মধ্যে বাড়ছে এইচআইভি শনাক্তের হার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নতুন শনাক্ত এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪২ শতাংশ অবিবাহিত তরুণ-তরুণী। আগের বছর ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তরুণ বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

রাজধানীর বাইরের চিত্রও উদ্বেগজনক। যশোরে ২০২৫ সালে ৫০ জনের বেশি মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়েছেন। যশোরের সিভিল সার্জন মো. মাসুদ রানা জানান, আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

সিভিল সার্জন বলেন, ‘এই বয়সের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা কম; কিন্তু কৌতূহল অনেক বেশি। সেই কৌতূহল থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ শুরু হয়।’ তিনি জানান, এসব শিক্ষার্থীর মধ্যে সমকামী তরুণের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। সেগুলো হলো ইনজেক্টেবল ড্রাগের ব্যবহার। এতে একই সুচ একাধিকজন ব্যবহার করায় রক্তের মাধ্যমে সংক্রমণ দ্রুত ছড়ায়।

আছে ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ। অর্থাৎ কনডম ব্যবহার না করা, একাধিক সঙ্গী কিংবা সঙ্গীর স্বাস্থ্য অবস্থা সম্পর্কে না জানা। যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতাও এইচআইভি সংক্রমণ বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। এর কারণ হলো পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌনতা ও যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়া।

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডসের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর সায়মা খান বলেন, অবিবাহিতদের মধ্যে যে সংক্রমণ, তাঁদের বয়স মোটামুটিভাবে ২৫ বছরের মধ্যে ধরে নেওয়া যায়। এই বয়সটাতে অনেকেরই একধরনের রোমাঞ্চ থাকে। তাঁরা জীবনকে উপভোগ করতে চান। 

এই যে চাওয়া, সেখান থেকেই তাঁরা কোনো কিছু না ভেবেই বেপরোয়া যৌনাচারে লিপ্ত হয়ে পড়েন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা এর ঝুঁকির বিষয়টা জানেন না। এই না জানাটা তৈরি হয়েছে অসচেতনতা থেকে। এই যে অল্প বয়সী তরুণদের মধ্যে এইচআইভি ছড়িয়ে যাচ্ছে, এর মূল কারণটাই তো সচেতনতার অভাব।

এইচআইভি নিরাময়যোগ্য নয়। তবে নিয়মিত ওষুধ নিলে একজন এইচআইভি–আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন এবং অন্যের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে বলে জানান দেশের বিশিষ্ট ভাইরাসবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলেন, এইচআইভি–আক্রান্ত নারী ও পুরুষ নিয়মিত ওষুধ নিলে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

তবু বাস্তবতা হলো, অনেক তরুণ আক্রান্ত হওয়ার পরও দীর্ঘদিন পরীক্ষা করান না। কেউ কেউ আবার সামাজিক ভয় ও লজ্জার কারণে চিকিৎসা শুরু করতেও দেরি করেন।

অল্প বয়সে যৌনতার প্রতি ঔৎসুক্য বা কৌতূহল সব সময়ই ছিল ও আছে; কিন্তু এখন এর ভিন্ন ধরনের প্রকাশ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করেন সমাজতত্ত্ব ও মনস্তত্ত্ববিদেরা। সমাজের পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত ঘটছে। প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ এখানে ভূমিকা রাখছে। শিথিল হচ্ছে সামাজিক বন্ধন। নগরে আসছে নতুন নতুন মানুষ দ্রুত বিকশিত নগরায়ণের সঙ্গে। 

প্রযুক্তির হাত ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। আর এসবই আমাদের মূল্যবোধের ওপর একধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন মনস্তত্ত্ববিদ অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এতে অভিগম্যতা বাড়ছে তরুণদের। বলা যায়, অনেকটা বাধাহীন হয়ে গেছে। আবার এই জনগোষ্ঠীর ভেতরে আছে সচেতনতার অভাব, যৌনতা সম্পর্কে সঠিক ধারণারও অভাব।

অল্প বয়সী বা তরুণ–তরুণীদের মধ্যে এইচআইভি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের বলে মনে করেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি বলছিলেন, এ বয়সটা ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঝুঁকি কমাতে স্কুল পর্যায়ে প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে শিক্ষাদান কতটা হচ্ছে তার দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। এইচআইভি সংক্রমণ রোধে একাধিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। সে কাজ কতটা ফলপ্রসূ হচ্ছে, সে ব্যাপারে খোঁজ–খবর ও পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।