স্বাস্থ্য
আইসিডিডিআরবির গবেষণা
আইসিইউতে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর থাবা, সংক্রমিত রোগীর মৃত্যুহার ৯০ শতাংশের বেশি
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) এখন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। সেখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া, যা চিকিৎসাকে করে তুলছে অত্যন্ত কঠিন। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার সময় যেসব রোগীর শরীরে এ ধরনের জীবাণু ছিল না, তাদের অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সংক্রমিত হচ্ছেন। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া রোগীদের ৯০ শতাংশেরও বেশি মারা যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত দুটি গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে। শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণাগুলো আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি ৩৬৩ নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশের শরীরে কঠিন-চিকিৎসাযোগ্য গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। ভর্তির সময় জীবাণুমুক্ত থাকা ১৯৮ রোগীর মধ্যে ১০৫ জন, অর্থাৎ ৫৩ শতাংশ, আইসিইউতে থাকার সময় সংক্রমিত হন। গবেষকদের মতে, এটি হাসপাতালের ভেতরে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
এছাড়া যেসব রোগীর শরীরে পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে, তাদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মৃত্যুবরণ করেছেন। এই উচ্চ মৃত্যুহার চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে দ্বিতীয় গবেষণায় কিছু ইতিবাচক ফলও পাওয়া গেছে। ঢাকার একটি নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, হাত ধোয়ার অভ্যাস, পরিচ্ছন্নতা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করার পর মাত্র সাত মাসে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ৮৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে প্রতি ১০০ নবজাতকের মৃত্যুহার ২৬ থেকে কমে ৪-এ নেমে এসেছে।
গবেষণায় মূলত এমন এক ধরনের ব্যাকটেরিয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেগুলো প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকেও কার্যকর সাড়া দেয় না। ফলে নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহ, মূত্রনালী ও ক্ষত সংক্রমণের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষকদের মতে, সীমিত চিকিৎসা সুবিধা, অতিরিক্ত রোগীর চাপ এবং হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে এই উচ্চ মৃত্যুহার দেখা যাচ্ছে। উন্নত জিনোম সিকোয়েন্সিং বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ব্যাকটেরিয়াও পরবর্তীতে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নিতে পারে।
গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন জানান, আইসিইউতে রোগীদের দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণ এবং ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা গেছে কীভাবে এই প্রতিরোধী জীবাণু ছড়ায় এবং সুপ্ত অবস্থা থেকে সংক্রমণে পরিণত হয়।
এএমআর গবেষণা ইউনিটের প্রধান ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, আইসিইউতে অবস্থানকালে অর্ধেকের বেশি রোগী নতুন করে সংক্রমিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, রোগীর সুরক্ষায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলায় বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।