সারাবিশ্ব

উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দী ইস্যুতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করল দক্ষিণ কোরিয়া


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০০ পিএম

উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দী ইস্যুতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করল দক্ষিণ কোরিয়া
ছবি: সংগৃহীত

উত্তর কোরিয়ার দুই যুদ্ধবন্দীকে ইউক্রেন থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশ্যে আনার ঘটনায় ইউক্রেনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রতিবাদ জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। এ ঘটনায় সিউলে নিযুক্ত ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত আন্দ্রি ভিয়েশকিনকে তলব করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশের বিষয়ে ইউক্রেনের কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং ক্ষমা চেয়েছে সিউল।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সোমবার রাষ্ট্রদূত ভিয়েশকিনকে ডেকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক বক্তব্য নিয়ে সরকারের ‘তীব্র অসন্তোষ’ জানানো হয়। সিউলের অভিযোগ, দুই দেশের মধ্যে ওই দুই উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীর হস্তান্তরের বিষয়টি গোপন রাখার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে জেলেনস্কি প্রকাশ্যে জানান, ইউক্রেন সম্প্রতি রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় এর গোপনীয়তা রক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে উত্তর কোরিয়ায় থাকা যুদ্ধবন্দীদের পরিবারের নিরাপত্তা, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করেই হস্তান্তরটি গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংও এর আগে বলেছিলেন, বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা দুই দেশের মধ্যে হওয়া গোপনীয়তা রক্ষার সমঝোতার লঙ্ঘন।

বিতর্ক আরও জটিল হয় যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে এ ধরনের কোনো গোপনীয়তা চুক্তি ছিল না। দক্ষিণ কোরিয়া এই বক্তব্যেরও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সিউলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউক্রেন বিভিন্ন পর্যায়ে যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তর নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করেছিল এবং বিষয়টি গোপন রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছিল। পরে হস্তান্তর সম্পন্ন হলেও জাতিসংঘে জেলেনস্কির বক্তব্যের মাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, ইউক্রেনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্য বক্তব্য দেওয়ার আগে পর্যাপ্ত পরামর্শ ও বিস্তারিত সমন্বয় করা হয়নি। সিউলের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে গোপনীয়তা চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করায় দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় একই সঙ্গে জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে এ ঘটনায় আরও পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি তারা বিবেচনা করছে।

অন্যদিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তরের বিস্তারিত প্রক্রিয়া প্রকাশ করেনি; শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে তাদের হস্তান্তরের বিষয়টি জানিয়েছে। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সহযোগী দিমিত্রো লিটভিনের বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো ঘটনাটি গোপন রাখার বিষয়টি ইউক্রেনের কাছে স্বাভাবিক মনে হয়নি। ফলে দুই দেশের মধ্যে মূল বিরোধ এখন যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তর নয়, বরং সেই তথ্য কতটা গোপন রাখার বিষয়ে আগে থেকে সমঝোতা ছিল-তা নিয়ে।

ঘটনার সূত্রপাত আরও আগে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর হাতে ওই দুই উত্তর কোরীয় সেনা বন্দী হন। তারা রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেওয়া উত্তর কোরীয় সেনাদের একটি দলের অংশ ছিলেন। পরে ওই দুই বন্দী দক্ষিণ কোরিয়ায় যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের ইচ্ছা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা বিবেচনায় নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তাদের হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা চলছিল।

দক্ষিণ কোরিয়া এর আগে ওই দুই সেনা দেশটিতে পৌঁছেছেন কি না, তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি। সিউলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তাদের পরিচয় বা অবস্থান প্রকাশ করলে উত্তর কোরিয়ায় থাকা পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ কারণেই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হয়েছিল বলে দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এদিকে ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে কাজ করছে এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে। ফলে উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীদের হস্তান্তরকে ঘিরে ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকাশ্য মতবিরোধ দুই দেশের সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণেও বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।