সারাবিশ্ব
জাতিসংঘ অধিবেশনে আব্বাসের যোগদান ঠেকাল যুক্তরাষ্ট্র, ফের ভিসা নিষেধাজ্ঞা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে যাওয়ার কথা থাকলেও ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে প্রবেশের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার আগে এ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে দুটি ফিলিস্তিনি সূত্র। বিষয়টি নিয়ে নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ সংশ্লিষ্ট ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন নতুন করে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ওপর আরোপ করা ভিসা-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে। যদিও ওই ঘোষণায় মাহমুদ আব্বাসের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি, তবে ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শান্তি প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।
গত বছরের আগস্টে প্রথমবারের মতো এ ধরনের ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় নিউইয়র্কে জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনে অংশ নিতে যাওয়া প্রায় ৮০ জন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল। এবারও একই ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভিসা নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বক্তব্যেও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) এবং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা (পিএলও)-কে ঘিরে বেশ কিছু অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ‘সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত’ করা এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কর্মকাণ্ড চালানো হচ্ছে।
১৯৯০-এর দশকে স্বাক্ষরিত অসলো শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠিত হয়। একই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থাকে ফিলিস্তিনি জনগণের আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর বিনিময়ে পিএলও ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় এবং সহিংসতা পরিত্যাগের ঘোষণা করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে শান্তি প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে এগিয়ে না যাওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নিষেধাজ্ঞার তীব্র সমালোচনা করেছে। মন্ত্রণালয়টি এ পদক্ষেপকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে বলেছে, এমন সিদ্ধান্ত পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংলাপ ও রাজনৈতিক উদ্যোগের পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে করা অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে জবাবদিহি দাবি করা ফিলিস্তিনিদের বৈধ অধিকার। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করাকে তারা সেই অধিকার প্রয়োগের অংশ হিসেবে দেখছেন।
মাহমুদ আব্বাসকে ভিসা না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়টি জাতিসংঘের কূটনৈতিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘ সদরদপ্তর চুক্তি অনুযায়ী, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের কার্যক্রমে অংশ নিতে বিদেশি কূটনীতিকদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। তবে ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, নিরাপত্তা, চরমপন্থা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে।
ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এবং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।