সারাবিশ্ব
কাহবুব পাহাড় দখলে হুতিদের তৎপরতা, বাব আল-মানদেব ঘিরে বাড়ছে সামরিক উত্তেজনা
ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাহবুব পাহাড় ঘিরে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এই পাহাড়ি এলাকায় অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে হুতিরা-এমন দাবি করেছে স্থানীয় সামরিক সূত্রগুলো। অঞ্চলটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং বাব আল-মানদেবের নিকটবর্তী হওয়ায় কাহবুবের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের চলমান সংঘাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
কাহবুব পাহাড়শ্রেণি বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। এখানকার উঁচু পাহাড়ি অবস্থান থেকে প্রণালি, আশপাশের উপকূলীয় এলাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের দিকে নজরদারি চালানোর সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কৌশলগত মায়ুন দ্বীপের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটির সামরিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেবের আশপাশে হুতিদের সাম্প্রতিক তৎপরতার মধ্যে কাহবুব পাহাড় নিয়ন্ত্রণের লড়াই তাই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন ফ্রন্ট হিসেবে সামনে এসেছে।
হুতিদের হামলা প্রতিহতের দাবি
কাহবুব ফ্রন্টে হুতিদের কয়েক দফা হামলা প্রতিহত করার দাবি করেছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌথ বাহিনী। তাদের দাবি, পাহাড়ি এলাকায় আরও ভেতরে প্রবেশ এবং নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে হুতিরা বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়। এসব অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যোদ্ধাও মোতায়েন করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে সরকারপন্থী বাহিনী।
সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে হুতিদের কয়েকজন যোদ্ধা নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছে। একই সময়ে হুতিদের ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম, যানবাহন এবং কয়েকটি অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা।
এ ছাড়া কাহবুব পাহাড়ের আকাশসীমায় উড়তে থাকা একটি ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করার দাবিও করেছে সরকারপন্থী বাহিনী। তবে হতাহত, সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস এবং ড্রোন ভূপাতিত করার এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আল-মুদারাবা ফ্রন্টেও সংঘর্ষ
কাহবুবের পাশাপাশি আল-মুদারাবা ফ্রন্টেও হুতিদের একটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি করেছে সরকারপন্থী ন্যাশনাল শিল্ড বাহিনী। বাহিনীটির দাবি, সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডের সহযোগিতায় তারা হুতিদের ওই অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে দেয়।
ন্যাশনাল শিল্ড বাহিনীর ভাষ্য, ওই অভিযানে দুই হুতি যোদ্ধাকে আটক করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে। তবে এসব দাবিরও স্বাধীন কোনো যাচাই পাওয়া যায়নি।
ইয়েমেনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন ফ্রন্টে সাম্প্রতিক লড়াইয়ে ন্যাশনাল শিল্ড বাহিনী এবং সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডসহ বিভিন্ন সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মোখা ও বাব আল-মানদেবসংলগ্ন এলাকাগুলোতেও হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে এসব বাহিনীকে সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ কাহবুব পাহাড়?
কাহবুব পাহাড়ের কৌশলগত গুরুত্বের মূল কারণ এর ভৌগোলিক অবস্থান। পাহাড়শ্রেণিটি বাব আল-মানদেব প্রণালির খুব কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে প্রণালি ও আশপাশের বিস্তৃত উপকূলীয় এলাকার ওপর নজরদারি করা সম্ভব। ফলে যে পক্ষ কাহবুবের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমিগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে, তারা ওই অঞ্চলে সামরিকভাবে তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
ইয়েমেনি সামরিক বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণগুলোতে বলা হয়েছে, কাহবুবের নিয়ন্ত্রণ কেবল স্থলভাগে সামরিক অগ্রযাত্রার বিষয় নয়। বরং এখানকার পাহাড়ি অবস্থান বাব আল-মানদেবের নৌ চলাচলের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরির সুযোগও দিতে পারে। একই সঙ্গে মায়ুন দ্বীপ ও প্রণালির প্রবেশপথের কাছাকাছি অবস্থান হুতিদের সামরিক অবস্থানকে আরও সুরক্ষিত করার ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাব আল-মানদেব ঘিরে হুতিদের অবস্থান
কাহবুবকে ঘিরে নতুন করে সংঘর্ষ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় হুতিদের সামরিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং বাব আল-মানদেবসংলগ্ন অঞ্চল নিয়ে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
বিশেষ করে মায়ুন দ্বীপের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বীপটি বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছে অবস্থিত হওয়ায় অঞ্চলটির সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলে এর গুরুত্ব রয়েছে। ফলে মায়ুন দ্বীপ ও এর আশপাশের স্থলভাগে সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার যেকোনো প্রচেষ্টা বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে পশ্চিম উপকূলের বিস্তৃত এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখা যেকোনো পক্ষের জন্যই বড় ধরনের সামরিক ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় সেনা, অস্ত্র, খাদ্য ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বিভিন্ন ফ্রন্টে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বজায় রাখা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পাহাড়ি অবস্থান কেন সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?
পাহাড়ি ভূখণ্ড সাধারণত পর্যবেক্ষণ ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দেয়। কাহবুবের মতো উঁচু এলাকায় অবস্থান নেওয়া হলে আশপাশের নিচু ভূমি ও যোগাযোগপথ পর্যবেক্ষণ করা তুলনামূলক সহজ হয়। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষের অগ্রযাত্রা ঠেকাতেও পাহাড়ি অবস্থান ব্যবহার করা যায়।
এই কারণে হুতিরা যদি কাহবুবের গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি অবস্থানগুলোতে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করতে পারে, তাহলে পশ্চিম উপকূলে তাদের অবস্থানকে সুরক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারপন্থী বাহিনীর পাল্টা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা গড়ে তোলার সুযোগ পেতে পারে। বিপরীতে সরকারপন্থী বাহিনী কাহবুব নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে বাব আল-মানদেবের দিকে হুতিদের স্থলভিত্তিক অগ্রযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ
বাব আল-মানদেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। লোহিত সাগরের সঙ্গে এডেন উপসাগরের সংযোগকারী এই প্রণালি দিয়ে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালির আশপাশে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাত তৈরি হলে এর প্রভাব শুধু ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই।
এলাকাটিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচলের ব্যয়, বিমা খরচ এবং পণ্য পরিবহনের সময় বাড়তে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে কিছু জাহাজকে দীর্ঘতর বিকল্প নৌপথ ব্যবহারের কথাও বিবেচনা করতে হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কাহবুব কি হয়ে উঠছে নতুন গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট?
ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে কাহবুব পাহাড়ও তেমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্ট হিসেবে সামনে আসছে। হুতিদের পশ্চিম উপকূলীয় অবস্থান এবং বাব আল-মানদেবসংলগ্ন এলাকায় তাদের সামরিক তৎপরতার সঙ্গে কাহবুবের লড়াইকে আলাদাভাবে দেখার সুযোগ কম।
হুতিরা কাহবুবের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল বা সেখানে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি শক্তিশালী করতে পারলে বাব আল-মানদেব ও মায়ুন দ্বীপের আশপাশে তাদের অবস্থান আরও সুসংহত হতে পারে। অন্যদিকে সরকারপন্থী বাহিনী যদি পাহাড়ি এলাকাগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়, তাহলে হুতিদের দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী স্থল অগ্রযাত্রার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
ফলে কাহবুব পাহাড় ঘিরে বর্তমান সংঘর্ষ শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের আরেকটি অধ্যায় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের প্রশ্নও। আগামী দিনে কাহবুব ও এর আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় কোন পক্ষ কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপর বাব আল-মানদেব ঘিরে সামরিক পরিস্থিতির নতুন গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।