সারাবিশ্ব

রুশ তেল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের কড়া বার্তা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাবের সতর্কতা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

রুশ তেল ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে ভারতের কড়া বার্তা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রভাবের সতর্কতা
ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে ভারত-মার্কিন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে নয়াদিল্লি। মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ রাশিয়ার জ্বালানি ক্রয় অব্যাহত রাখা দেশগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রেখে একটি নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কসংক্রান্ত বিল অনুমোদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতের পক্ষ থেকে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়।

রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর লক্ষ্যে তৈরি বিলটি বুধবার মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হয়। প্রস্তাবিত আইনে রাশিয়ার জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা খাত, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে রাশিয়ার তেল পরিবহনে ব্যবহৃত কথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে দেশগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব। এর আওতায় রাশিয়ার বড় জ্বালানি ক্রেতা ভারত ও চীনও পড়তে পারে। পাশাপাশি ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার সুযোগও রাখা হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদের অনুমোদনের পর বিলটি এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।

ভারতের কড়া অবস্থান

বিলটি পাস হওয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে নয়াদিল্লি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাশিয়া থেকে তেল আমদানির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

ভারতের বক্তব্য, রাশিয়ার তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য নতুন পদক্ষেপের প্রভাব শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে। এ বিষয়ে ভারত নিজেদের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে বলে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নয়াদিল্লি আরও জানিয়েছে, দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সম্ভাব্য নতুন মার্কিন শুল্কের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাতের বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে বলেও জানানো হয়েছে।

কেন রাশিয়ার তেল কিনছে ভারত?

ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ এবং রাশিয়ারও অন্যতম বড় তেল ক্রেতা। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলো মস্কোর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পর রাশিয়া তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল বিক্রি শুরু করলে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলো রুশ তেল আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়।

নয়াদিল্লি বরাবরই বলে আসছে, বিশাল জনসংখ্যা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত অর্থনীতির জ্বালানি চাহিদা পূরণে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই যুক্তিতেই পশ্চিমা দেশগুলোর চাপের মধ্যেও রাশিয়া থেকে তেল কেনার বিষয়ে নিজেদের নীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেছে ভারত।

তবে ভারতীয় সরকার একই সঙ্গে বলে আসছে, তারা কোনো একটি দেশের ওপর জ্বালানি সরবরাহের জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে চায় না। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, সরবরাহের নিরাপত্তা ও দেশের প্রয়োজন বিবেচনায় বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করাই তাদের নীতি।

১০০ শতাংশ শুল্ক এখনই কার্যকর হচ্ছে না

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হওয়া মানেই ভারতের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে গেছে—এমনটি নয়। প্রস্তাবিত আইনটি কার্যকর হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন। এরপর কোন দেশ বা কোন পণ্যের ওপর কী মাত্রায় শুল্ক আরোপ করা হবে, সেটি মার্কিন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।

প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি ২৬২-১৫৯ ভোটে পাস হওয়ার আগে মার্কিন সিনেটেও এটি অনুমোদিত হয়েছিল। ফলে ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করলে রাশিয়ার জ্বালানি কেনা অব্যাহত রাখা দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি আইনি কাঠামো তৈরি হতে পারে।

ভারত-মার্কিন বাণিজ্য সম্পর্কেও প্রভাবের আশঙ্কা

নতুন এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য নিয়ে আলোচনা চলছে। ফলে রাশিয়ার তেল কেনাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন শুল্ক দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য উচ্চ ব্যয় এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারতীয় পরিশোধনাগারগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ রয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানিতে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে ভারতকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হতে পারে, যার ফলে আমদানি ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।

অন্যদিকে, রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ভারতের প্রধান যুক্তি হলো জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। ফলে ওয়াশিংটনের নতুন চাপের মুখে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি, দেশের জ্বালানি চাহিদা, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক-এই বিষয়গুলোর মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখে নয়াদিল্লি, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।