বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি
মানুষের কাছাকাছি শরীরের তাপমাত্রা! টি-রেক্স ‘উষ্ণরক্তের’ ছিল, মিলল নতুন প্রমাণ
প্রায় ছয় দশক ধরে বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন ছিল-ভয়ংকর শিকারি ডাইনোসর টাইরানোসরাস রেক্স বা টি-রেক্স কি উষ্ণরক্তের প্রাণী ছিল? এবার সেই দীর্ঘদিনের বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সামনে এসেছে। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা সরাসরি টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। গবেষণার ফল অনুযায়ী, প্রাণীটির শরীরের তাপমাত্রা ছিল প্রায় ৯৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা মানুষের স্বাভাবিক শরীরের তাপমাত্রার খুব কাছাকাছি।
এর আগে ২০২২ সালে আলাস্কায় টি-রেক্সের একটি জীবাশ্ম পদচিহ্ন আবিষ্কৃত হওয়ার পরও এদের উষ্ণরক্তের প্রাণী হওয়ার ধারণা আরও জোরালো হয়েছিল। কারণ, ওই অঞ্চলের তীব্র ঠান্ডা পরিবেশেও টি-রেক্সের মতো বড় শিকারি ডাইনোসরের বিচরণ তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। সাধারণ শীতলরক্তের সরীসৃপের শরীরের তাপমাত্রা মূলত বাইরের পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এত ঠান্ডা পরিবেশে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা তাদের জন্য কঠিন।
সম্প্রতি বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত নতুন গবেষণায় এই প্রশ্নের আরও প্রত্যক্ষ উত্তর পাওয়া গেছে। গবেষকরা টি-রেক্সের দাঁতের এনামেল বিশ্লেষণ করে এর শরীরের তাপমাত্রা নির্ধারণ করেছেন। গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনা নেওয়া হয়েছে ‘থমাস দ্য টি-রেক্স’ নামে পরিচিত প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পূর্ণ একটি কঙ্কাল থেকে। কঙ্কালটি লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।
গবেষকদের হাতে থাকা কঙ্কালের প্রদর্শনীতে না থাকা দুটি দাঁত থেকে মাত্র কয়েক মিলিগ্রাম এনামেল সংগ্রহ করা হয়। এত সামান্য নমুনা দিয়েই বিজ্ঞানীরা প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছরের পুরোনো প্রাণীটির শরীরের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা পেতে সক্ষম হন। গবেষণাটি পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন লস অ্যাঞ্জেলেসের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউসিএলএ) ভূ-জীববিজ্ঞানী ও সহযোগী অধ্যাপক রবার্ট ইগল এবং জলবায়ু বিজ্ঞানী আরাধনা ত্রিপাঠিসহ অন্য গবেষকেরা।
রবার্ট ইগলের মতে, এটি এখন পর্যন্ত টি-রেক্সের প্রকৃত শরীরের তাপমাত্রা নির্ধারণের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ প্রমাণগুলোর একটি। প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ থেকে ৬ কোটি ৬০ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করা এই বিশাল শিকারি কীভাবে বেঁচে থাকত, তার জীবনযাত্রা ও বিপাকীয় বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে এই গবেষণা নতুন সুযোগ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞানীরা দাঁতের এনামেলকে অনেকটা প্রাগৈতিহাসিক থার্মোমিটার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। দাঁতের এনামেলের মধ্যে থাকা কার্বন ও অক্সিজেনের বিভিন্ন আইসোটোপ নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বিশেষ ধরনের বন্ধন তৈরি করে। তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে এসব বন্ধনের মাত্রাও পরিবর্তিত হয়। ফলে এনামেলের রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণ করে দাঁত তৈরির সময় প্রাণীটির শরীরের তাপমাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
এই পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো দাঁতের এনামেল অত্যন্ত শক্ত এবং দীর্ঘ সময় ধরে রাসায়নিক পরিবর্তন থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত থাকে। কোটি কোটি বছর পরও এনামেলের মধ্যে থাকা রাসায়নিক সংকেত অনেকাংশে সংরক্ষিত থাকতে পারে। ফলে জীবাশ্মের হাড়ের তুলনায় দাঁতের এনামেল প্রাচীন প্রাণীর শরীরের তাপমাত্রা নির্ধারণে বেশি কার্যকর নমুনা হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক আরাধনা ত্রিপাঠি বলেন, এত বিখ্যাত একটি প্রাণী সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে এত কম সরাসরি তথ্য থাকা বিস্ময়কর। এতদিন হাড়ের গঠন, শরীরের আকৃতি ও বায়োমেকানিক্সের ওপর ভিত্তি করে টি-রেক্সের বিপাকীয় হার ও জীবনযাপন সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা দেওয়া হলেও এর প্রকৃত শরীরের তাপমাত্রা নির্দিষ্টভাবে জানা ছিল না। এবার দাঁতের এনামেলের রাসায়নিক সংকেত সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও মেরুদণ্ডী প্রাণীর প্রাক্জীববিজ্ঞানী থমাস হোল্টজ জুনিয়রও গবেষণাটির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তার মতে, ১৮৪২ সালে রিচার্ড ওয়েন প্রথমবারের মতো ‘ডাইনোসর’ নামটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার পর থেকেই এসব প্রাণী উষ্ণরক্তের ছিল কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহ রয়েছে। নতুন আইসোটোপভিত্তিক পদ্ধতি সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্ন যাচাই করার আরও সরাসরি সুযোগ তৈরি করেছে।
টি-রেক্সকে সরীসৃপ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হলেও এর প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস শরীরের তাপমাত্রা আধুনিক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের সঙ্গে তুলনীয়। সাধারণ শীতলরক্তের সরীসৃপের শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এবং তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে টি-রেক্সের শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বাইরের পরিবেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি থাকার প্রমাণ তাদের বিপাকীয় বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়।
উষ্ণ শরীরের এই বৈশিষ্ট্য টি-রেক্সকে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকার ক্ষেত্রে সুবিধা দিয়ে থাকতে পারে। আধুনিক কুমিরের মতো শীতলরক্তের প্রাণীরা শরীর গরম রাখার জন্য অনেকাংশে পরিবেশের তাপের ওপর নির্ভর করে এবং দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন। বিপরীতে, টি-রেক্স যদি নিজেই শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত, তাহলে শিকার ধাওয়া করা, দীর্ঘ সময় চলাফেরা করা এবং ঠান্ডা পরিবেশে সক্রিয় থাকার ক্ষেত্রে তারা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকতে পারে।
ডাইনোসরদের সঙ্গে আধুনিক পাখিদের বিবর্তনীয় সম্পর্কও এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। টি-রেক্সের শরীরের তাপমাত্রা আধুনিক পাখিদের তুলনায় কম হলেও সাধারণ সরীসৃপের তুলনায় অনেক বেশি। এ কারণে তাদের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যকে সরীসৃপ ও আধুনিক উষ্ণরক্তের প্রাণীদের মধ্যকার বিবর্তনীয় পরিবর্তন বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই উষ্ণ বিপাকীয় ব্যবস্থা টি-রেক্সকে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও সুবিধা দিয়ে থাকতে পারে। গবেষকদের জলবায়ু পুনর্গঠন অনুযায়ী, তৎকালীন উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন পরিবেশে-বর্তমান মেক্সিকো থেকে শুরু করে অত্যন্ত ঠান্ডা আলাস্কা পর্যন্ত-টি-রেক্সের বসবাসের সম্ভাবনা ছিল। অর্থাৎ, পরিবেশের তাপমাত্রা কম হলেও নিজস্ব শরীরের তাপ ধরে রাখার সক্ষমতা তাদের এমন অঞ্চলেও টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারে যেখানে সাধারণ শীতলরক্তের সরীসৃপের জন্য দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা কঠিন।
তবে উষ্ণরক্তের শরীরের সুবিধার পাশাপাশি বড় ধরনের চাহিদাও ছিল। শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং উচ্চ বিপাকীয় হার বজায় রাখতে টি-রেক্সের বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হতো। সেই শক্তি সরবরাহের জন্য তাদের প্রচুর খাবার গ্রহণ করতে হতো। ফলে বিশাল এই শিকারিকে নিয়মিত শিকারে যেতে এবং পর্যাপ্ত খাদ্য সংগ্রহ করতে হতো।
গবেষকরা মনে করছেন, এই ধরনের আইসোটোপভিত্তিক ‘প্যালিওথার্মোমেট্রি’ বা প্রাগৈতিহাসিক তাপমাত্রা নির্ণয় পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও অনেক বিলুপ্ত প্রাণীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু ডাইনোসরদের শরীরের তাপমাত্রাই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে কখন এবং কীভাবে বিভিন্ন প্রাণী উষ্ণরক্তের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল, সেই বিবর্তনীয় রহস্যও আরও পরিষ্কার হতে পারে।