ক্যাম্পাস
এআই দিয়ে পরীক্ষায় উত্তর লেখার দায়ে ঢাবির ছাত্রদল ও শিবির নেতাকে শাস্তি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা ব্যবহার করে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। শাস্তি পাওয়া দুই শিক্ষার্থী হলেন মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল ছাত্রদলের সদস্য ফাতহুন কারিব চৌধুরী এবং হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ছাত্র সংসদের শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ফেরদাউস।
দুই শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের ১৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কারিব চৌধুরীকে ‘পরীক্ষা +২’ এবং ফেরদাউসকে ‘পরীক্ষা +১’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে কারিব যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করেছেন, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী দুটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন না। অন্যদিকে, ফেরদাউসের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গত ১১ জুন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের একটি পরীক্ষা চলাকালে কারিব চৌধুরীকে দুই পায়ের মাঝখানে মোবাইল ফোন রেখে ব্যবহার করতে দেখা যায়। পরে তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবা জেমিনিতে করা অনুসন্ধানের তথ্য পাওয়া যায়। সেখানে পরীক্ষার প্রথম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল।
পরীক্ষা শুরুর পর সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে তার উত্তরপত্র জব্দ করা হয়। তখন উত্তরপত্রে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তরের কিছু অংশ লেখা ছিল। পরে জেমিনিতে ওই প্রশ্ন লিখে পাওয়া উত্তরের সঙ্গে কারিবের উত্তরপত্রে লেখা দুই লাইনের হুবহু মিল পাওয়া যায়। এরপর উত্তরপত্র ও সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
বিষয়টি পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা পরিষদের সভায় উত্থাপিত হয়। গত ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় আলোচনার পর কারিবের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে শাস্তি পেয়েছেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল সংসদের নির্বাচিত কার্যনির্বাহী সদস্য মো. ফেরদাউস। তিনি তৎকালীন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে কার্যনির্বাহী সদস্য পদে নির্বাচিত হন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১০৭ নম্বর কোর্সের পুনঃপরীক্ষা চলাকালে আনুমানিক বেলা ১১টার দিকে শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পরীক্ষার হল থেকে বের হন ফেরদাউস। পরে বিভাগের করিডরে গিয়ে এক সিনিয়র শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্মার্টফোন নিয়ে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
এ সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা তাকে আটক করেন। পরে জব্দ করা ফোনের অনুসন্ধান ইতিহাস পরীক্ষা করে পরীক্ষায় আসা প্রশ্নগুলোই সেখানে অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এরপর অসদুপায়ের প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক তার উত্তরপত্র প্রতিবেদনসহ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দপ্তরে পাঠান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী, বিষয়টি পরে শৃঙ্খলা পরিষদে পাঠানো হয়। ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত শৃঙ্খলা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে ৩১ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় ফেরদাউসের শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. হিমাদ্রি শেখর চক্রবর্তী স্বাক্ষরিত আদেশে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শাস্তির বিধান অনুযায়ী, ‘পরীক্ষা +১’ বলতে যে পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা হয়েছে, সেটি বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী আরও একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়াকে বোঝায়। একইভাবে ‘পরীক্ষা +২’ বলতে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা বাতিলের পাশাপাশি পরবর্তী দুটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা বোঝানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭ সেপ্টেম্বরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনসহ বিভিন্ন অপরাধের দায়ে বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মোট ৬৪ শিক্ষার্থীকে ‘পরীক্ষা +১’, ‘পরীক্ষা +২’ ও ‘পরীক্ষা +৩’ মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
এআই ব্যবহারের অভিযোগে একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর শাস্তির বিষয়টি সামনে আসায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর অসদুপায় ঠেকানোর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।