সারাবিশ্ব

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বাড়ছে, শি জিনপিংকে মিসরে জমকালো অভ্যর্থনা


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রভাব বাড়ছে, শি জিনপিংকে মিসরে জমকালো অভ্যর্থনা
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও হামলা-পাল্টা হামলার মধ্যেই মিসর সফরে গেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বুধবার রাজধানী কায়রোতে তাকে স্বাগত জানান মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। এই সফরের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।

কায়রোর আল-ইত্তিহাদিয়া প্রাসাদে শি জিনপিংকে সামরিক কুচকাওয়াজের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। গত এক দশকের মধ্যে এটিই চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম মিসর সফর।

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শির মিসর সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার মিসর

মিসর যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার। দেশটি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পেয়ে থাকে। তবে এর পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা ক্রমেই বাড়াচ্ছে কায়রো।

২০১৪ সালে সিসির চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারত্বের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্পর্ক বিস্তৃত হয়েছে।

মিসরের সাবেক কূটনীতিক আইমান জায়নেলদিনের মতে, বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করতে চায় মিসর। অন্যদিকে এশিয়ার বাইরে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী চীন। ফলে দুই দেশের স্বার্থের মধ্যে ক্রমেই সামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে।

শিকে ঘিরে কায়রোয় ব্যাপক আয়োজন

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে কেন্দ্র করে কায়রোতে ব্যাপক আয়োজন করা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক চীনের পতাকা দিয়ে সাজানো হয়। পাশাপাশি সাজসজ্জায় মিসরের স্ফিংক্স ও চীনের মহাপ্রাচীরের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার প্রতিকৃতিও তুলে ধরা হয়েছে।

মিসরের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দুই দেশের ইতিবাচক সম্পর্কের পাশাপাশি চীনের আধুনিক অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রচার করা হয়েছে।

সামরিক সহযোগিতায়ও ঘনিষ্ঠতা

চীন ও মিসরের সামরিক সহযোগিতার ঘনিষ্ঠতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ গত মাসের যৌথ সামরিক মহড়া। ‘ইগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের ওই মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফালে যুদ্ধবিমান অংশ নেয়। দুই দেশের বিমানবাহিনীর এমন যৌথ মহড়াকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ মিসর

মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায় চীন। এ ক্ষেত্রে মিসরের ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক প্রভাব ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বেইজিংয়ের জন্য দেশটিকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।

সুয়েজ খালের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মিসরের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেশি। পাশাপাশি ১১ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশটি চীনা পণ্য ও বিনিয়োগের জন্য বড় বাজার।

মিসরের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীন থেকে দেশটির আমদানির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আমদানি বেড়েছে ১৪ শতাংশের বেশি।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ারের মতে, বেইজিংয়ের কাছে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বড় অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগ এবং ফিলিস্তিন সংকটসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মিসরের কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

বিভিন্ন খাতে চীনের বড় বিনিয়োগ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান মিসরে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন, লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও উপগ্রহ উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে এসব বিনিয়োগ রয়েছে।

এ ছাড়া কায়রোর পূর্বদিকে নির্মাণাধীন নতুন প্রশাসনিক রাজধানীর ব্যবসায়িক এলাকাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।

সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র মিসরের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের দ্রুত বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে।