জাতীয়
৫ আগস্ট শুধু দিবস নয়, ফ্যাসিবাদ থেকে এটি জাতির পুনর্জন্মের দিন: প্রধান উপদেষ্টা
গণতান্ত্রিক, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে জাতির সামনে দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সকালে, ঢাকায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন তিনি। তার বক্তব্যে ফুটে ওঠে জাতির দীর্ঘ নিপীড়নের ইতিহাস, তরুণ প্রজন্মের বঞ্চনার গল্প, এবং একটি নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের সংকল্প।
ড. ইউনূস বলেন, “৫ আগস্ট শুধু একটি দিবস নয়—এটি এক প্রতিজ্ঞা, এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যেদিন জাতি ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে পুনর্জন্ম লাভ করে। এই দিন আমাদের গণজাগরণ, সংহতি ও স্বপ্ন দেখার দিন। আজ আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু সেই স্বাধীনতা আজও পূর্ণতা পায়নি—বৈষম্য, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির জালে তা বন্দি হয়ে আছে।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘ ১৬ বছর দেশের তরুণ সমাজ হতাশায় নিমজ্জিত ছিল। “ভালো ফলাফল করেও তারা ঘুরেছে তদবিরের দ্বারে দ্বারে। চাকরিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছিল দুর্নীতি, কোটা বৈষম্য, স্বজনপ্রীতি। যারা ঘুষ দিতে পারেনি বা ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে পারেনি, তাদের জন্য সরকারি চাকরি ছিল স্বপ্নের মতো।”
তিনি জানান, সরকারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, এমনকি বিচার বিভাগ পর্যন্ত মাফিয়াতন্ত্রের কবলে পড়ে গিয়েছিল। “সামান্য সমালোচনার দায়ে হাজারো মানুষ গুম ও গ্রেফতারের শিকার হয়েছে। পুলিশ ও দলীয় সন্ত্রাসীদের দিয়ে আন্দোলন দমন করা হয়েছে। চিকিৎসা না দিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে অনেককে। এমনকি হাসপাতালগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল যেন আহতদের ভর্তি না করা হয়।”
ড. ইউনূস বলেন, “২০২৪ সালের উত্তাল জুলাই আন্দোলন ছিল এই দীর্ঘ নিপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বস্তরের মানুষের এক বিস্ফোরণ। ছাত্র, তরুণ, সাধারণ মানুষ—সবাই এক কণ্ঠে বলেছিল, ‘ফ্যাসিবাদীদের এবার যেতে হবে।’ কিন্তু ক্ষমতা রক্ষার মরিয়া চেষ্টায় সরকার গুলি চালায়, গ্রেফতার করে, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়—সবকিছুই করে তথ্য গোপন করার জন্য।”
তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন “জুলাই শহীদ” ও আহতদের। বলেন, “এই জাতি তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ। ইতোমধ্যে শহীদ পরিবারের কল্যাণে ৯৮ কোটি ৪০ লাখ টাকার চেক ও সঞ্চয়পত্র দেওয়া হয়েছে ৭৭৫টি পরিবারকে। আহত ১৩ হাজার ৮০০ ‘জুলাই যোদ্ধা’ পেয়েছেন ১৫৩ কোটি ৪ লাখ টাকা। ৭৮ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে। তাদের চিকিৎসার জন্য দেওয়া হয়েছে আরও ৯৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা। জেলা-উপজেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে অগ্রাধিকার ভিত্তিক বিনামূল্যে চিকিৎসা।”
তিনি যোগ করেন, “আমরা অতীত স্মরণ করতে আসিনি, এসেছি শপথ নিতে—এই দেশ আর কোনোদিন নিপীড়নের কাছে মাথা নত করবে না। আমরা গড়বো এমন একটি রাষ্ট্র, যা জবাবদিহিমূলক, মানবিক এবং সকল বৈষম্যের ঊর্ধ্বে। যে রাষ্ট্র হবে সত্যিকারের জনগণের পক্ষে।”
ড. ইউনূস তার বক্তব্যের শেষাংশে বলেন, “জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না। তাদের রক্তেই লেখা হবে একটি নতুন বাংলাদেশের পথরেখা। আজকের এই দিন হোক আমাদের নতুন যাত্রার শপথের দিন।”