জাতীয়

শুটার ফয়সাল পালিয়ে যাওয়ার পর তৎপর সব সংস্থা, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা


ঢাকাপ্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৫৫ এএম

শুটার ফয়সাল পালিয়ে যাওয়ার পর তৎপর সব সংস্থা, প্রশ্নের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা
ছবি: সংগৃহীত

ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ওপর হামলার মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী মোটরসাইকেলচালক আলমগীর দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব সংস্থা।

ঘটনার পরপরই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হলে হামলাকারীরা এভাবে নির্বিঘ্নে পালাতে পারত না-এমন মত দিয়েছেন বিশ্লেষক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাদের ভাষায়, এটি আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতারই প্রতিফলন।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, শুটার ফয়সাল ও আলমগীর কীভাবে রাজধানী ছাড়ে, কোন রুট ব্যবহার করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে কার সহায়তায় ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যায়—এসব তথ্য এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। সীমান্ত পারাপারে সরাসরি যুক্ত থাকা দুই মানব পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়া ফয়সালের স্ত্রী, শ্যালক ও বান্ধবীকেও আটক করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মূল দুই অভিযুক্ত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, যা জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ওমর ফারুক বলেন, এ ধরনের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক ও হতাশা সৃষ্টি করে। হামলাকারীরা যেভাবে পালিয়ে যেতে পেরেছে, তাতে প্রশ্ন উঠছে—অপরাধীরা কি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ঊর্ধ্বে? যদি না হয়, তাহলে তাদের গ্রেফতার করা গেল না কেন?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, রাজধানীতে হত্যাচেষ্টার মতো অপরাধ করে সীমান্ত পেরিয়ে দুর্বৃত্তদের পালিয়ে যাওয়া এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেলফি প্রকাশ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি হতাশাজনক। এতে নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনার পর রাজধানীর প্রবেশপথে ব্লক রেড, অতিরিক্ত চেকপোস্ট এবং সীমান্তে কড়া নজরদারি জোরদার করা হলে হামলাকারীদের পালানো কঠিন হতো। কিন্তু নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, তাৎক্ষণিকভাবে এমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের ঘাটতিও ছিল স্পষ্ট।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, হাইকমান্ড থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও অ্যাকশন প্ল্যান সময়মতো দেওয়া হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এর সুযোগ নিয়েই হামলাকারীরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সীমান্ত পেরিয়ে যায়।

এই ঘটনায় ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ বিভাগ ও গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং ঢাকা রেঞ্জের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীতে এত বড় একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনার পরও তাৎক্ষণিকভাবে ব্যাপক তল্লাশি বা নজরদারি দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (অপরাধ ও অপস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধীরা অত্যন্ত ধূর্ত এবং পালানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করাই স্বাভাবিক। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের ধরা সম্ভব হয়নি—এটাই বাস্তবতা।

অন্যদিকে বিজিবি দাবি করেছে, হামলাকারীরা নিশ্চিতভাবে কোন সীমান্ত দিয়ে পালিয়েছে—তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। তবে সম্ভাব্য রুটগুলোতে টহল ও চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।

এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। গ্রেফতারদের মধ্যে রয়েছেন ফয়সালের স্ত্রী সামিয়া, শ্যালক শিপু, বান্ধবী মারিয়া, মোটরসাইকেলের মালিক আবদুল হান্নান, সীমান্ত পাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে সঞ্জয় চিসিম ও সিবিরন দিও এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী কবির। তাদের কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাদিকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল অন্তত দুই মাস আগে। হামলার পর কোন রুটে পালাবে, কোথায় আশ্রয় নেবে—সবকিছুই ছিল পূর্বনির্ধারিত। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামলার পর মোটরসাইকেলে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক পেরিয়ে মিরপুরে যায় তারা। সেখান থেকে একাধিক যানবাহন পরিবর্তন করে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছে সীমান্ত পার হয়।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা এবং আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থানের কারণে শরিফ ওসমান হাদিকে টার্গেট করা হয়। মামলাটি বর্তমানে ডিবির কাছে তদন্তাধীন রয়েছে।

সব মিলিয়ে শুটার ফয়সাল পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় শুধু অপরাধই নয়, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। জননিরাপত্তা ও আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই ব্যর্থতার দায় কীভাবে নিরূপণ ও সমাধান করা হবে—সেদিকেই এখন তাকিয়ে দেশবাসী।