জাতীয়
৭৫ হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীকে আগস্টেই অবসরভাতার টাকা দেবে সরকার
অবসরে যাওয়া ৭৫ হাজার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ও কল্যাণ সুবিধার অর্থ পরিশোধে এককালীন দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দ্রুত এই অর্থ ছাড় করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৫ আগস্ট ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে একযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে টাকা পাঠানোর কথা রয়েছে।
বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর জীবনের অন্যতম বড় আর্থিক ভরসা হলো অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে পাওয়া এককালীন অর্থ। অবসরের পর হজ পালন, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের বিয়ে কিংবা পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে অনেক শিক্ষক এই অর্থের ওপর নির্ভর করেন। তবে ২০২২ সাল থেকে অবসরে যাওয়া অনেক শিক্ষক-কর্মচারী এখনো তাঁদের প্রাপ্য অবসর ও কল্যাণের অর্থ পাননি। এতে দীর্ঘদিন ধরে চরম আর্থিক ভোগান্তিতে ছিলেন তাঁরা।
এ পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক। বৈঠকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে এককালীন দুই হাজার কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক বলেন, ২০২২ সাল থেকে যেসব শিক্ষক অবসর সুবিধার জন্য আবেদন করেছেন, তাঁদের অনেকেই এখনো কোনো অর্থ পাননি। শিক্ষকদের বেতন থেকে নিয়মিত চাঁদা কাটা হলেও অবসর ও কল্যাণ তহবিলে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং কিছু অর্থ দুর্বল ব্যাংকে আটকে থাকায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে শিক্ষকদের নিজেদের জমা দেওয়া অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন ছিল প্রায় দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার এককালীন দুই হাজার কোটি টাকা দেবে এবং বাকি ১০০ কোটি টাকা অবসর-কল্যাণ তহবিল থেকে নেওয়া হবে।
সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই অর্থের মাধ্যমে প্রায় ৭৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এককালীন পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত পেতে পারেন। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ধাপে অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ছয় মাসের মধ্যে বা তারও আগে দ্বিতীয় ধাপের অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অবসর সুবিধা বোর্ডে বর্তমানে ৭৫ হাজার আবেদন এবং কল্যাণ ট্রাস্টে ৪৪ হাজার আবেদন জমা রয়েছে। একই শিক্ষক-কর্মচারীর পক্ষ থেকে দুই জায়গায় আবেদন থাকায় মোট আবেদন সংখ্যা এক লাখ ১৯ হাজার হলেও প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ হাজার।
সচিব আবদুল খালেক বলেন, সুবিধাভোগী শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে। আগামী ১৫ আগস্ট ইএফটির মাধ্যমে তাঁদের নিজ নিজ ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আগে ১৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
অর্থ সংকটে অবসর ও কল্যাণ তহবিল
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন থেকে অবসর সুবিধা বোর্ডের জন্য ৬ শতাংশ এবং কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য ৪ শতাংশ অর্থ কেটে রাখা হয়। তবে এই অর্থ দিয়ে প্রতিবছর অবসরে যাওয়া সব শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দের ঘাটতির কারণে দীর্ঘদিন ধরে আবেদন জমতে থাকে।
অবসর সুবিধা বোর্ডে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া অর্থে প্রতি মাসে প্রায় ৭০ কোটি টাকা জমা হয়। এ ছাড়া বোর্ডের এফডিআর থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা আসে। অর্থাৎ প্রতি মাসে মোট আয় প্রায় ৭৩ কোটি টাকা। বিপরীতে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পাওনা পরিশোধে প্রয়োজন হয় প্রায় ১১৫ কোটি টাকা। ফলে প্রতি মাসে প্রায় ৪২ কোটি টাকার ঘাটতি থাকে।
অন্যদিকে কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি মাসে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে কেটে নেওয়া ৪ শতাংশ অর্থের মাধ্যমে প্রায় ৫০ কোটি টাকা জমা হয়। ট্রাস্টের এফডিআর থেকে আরও প্রায় ২ কোটি টাকা আসে। সব মিলিয়ে মাসিক আয় প্রায় ৫২ কোটি টাকা। অথচ আবেদন নিষ্পত্তি করে অর্থ পরিশোধে প্রতি মাসে প্রয়োজন হয় প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। ফলে এখানেও প্রায় ১৩ কোটি টাকা ঘাটতি থেকে যায়।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, আর্থিক সংকটের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকে তহবিলের অর্থ আটকে যাওয়ায় অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের কার্যক্রম আরও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর পাওনা একবারে পরিশোধ করতে সরকারের কাছ থেকে এককালীন প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের মহাসচিব মো. জাকির হোসেন। তিনি বলেন, অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের জন্য এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে দ্বিতীয় ধাপে বাকি অর্থ কবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চান তাঁরা।
জাকির হোসেন বলেন, প্রথম ধাপে অর্থ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপের অর্থ পরিশোধে যেন কোনো ধরনের অনাগ্রহ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তাঁর দাবি, শুধু শিক্ষক-কর্মচারীদের নিজেদের জমা দেওয়া অর্থ নয়, সরকারের অংশসহ তাঁদের প্রাপ্য পুরো অর্থই পরিশোধ করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন তুলনামূলক কম হওয়ায় অবসরের পর এককালীন এই অর্থ তাঁদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরো পাওনা একসঙ্গে পেলে শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরজীবনে নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে তা কাজে লাগাতে পারবেন।