জাতীয়
ডেঙ্গু ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল চিকিৎসক আঁচলের
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন চিকিৎসক ডা. আঁচল রায়। রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার মৃত্যুতে সহকর্মী ও চিকিৎসক মহলে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
ডা. আঁচল রায় ৪২তম বিসিএসের একজন কর্মকর্তা। তিনি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তাকে রেসপিরেটরি মেডিসিন বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছিল। চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবাও দিয়েছেন। এমনকি খুব শিগগিরই তার ডেঙ্গু ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। তবে সেই দায়িত্ব গ্রহণের আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারালেন তিনি।
স্বজন ও সহকর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে, অসুস্থ হওয়ার পর প্রথম চার দিন তিনি বাসায় থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পঞ্চম দিনে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। প্রথমে তাকে হাসপাতালের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সকালে তার মৃত্যু হয়।
ডা. আঁচল রায় সম্প্রতি ইন্টারনাল মেডিসিনে এফসিপিএসের মিড-টার্ম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। এর আগে তিনি যুক্তরাজ্যের এমআরসিপি পরীক্ষার পার্ট-ওয়ানও পাস করেন। চিকিৎসা পেশায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষায়ও এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
তার স্বামী বিপ্লব চন্দ্র দাস জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (নিপোর্ট)-এ কর্মরত। আঁচল ও বিপ্লব দুজনই তৎকালীন আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেন, যা বর্তমানে নোয়াখালী মেডিকেল কলেজ নামে পরিচিত। শিক্ষাজীবনে তাদের পরিচয় থাকলেও স্নাতক শেষ করার পর তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। প্রায় তিন বছর সম্পর্কের পর তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাদের দাম্পত্য জীবনের বয়স হয়েছিল প্রায় ১৭ মাস। তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
ডা. আঁচল রায়ের পৈতৃক বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হলেও তিনি ঢাকায় বেড়ে ওঠেন। ৪২তম বিসিএসের মাধ্যমে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কর্মজীবনে অল্প সময়ের মধ্যেই সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন দায়িত্বশীল ও নিবেদিত চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি পান।
ডা. আঁচল রায়ের মৃত্যুতে ৪২তম বিসিএসের সহকর্মীসহ চিকিৎসক সমাজে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেকেই শোক প্রকাশ করে তার স্মৃতিচারণ করেছেন।
তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, ডা. আঁচল রায়ের অকাল মৃত্যুতে স্বাস্থ্য পরিবার একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসককে হারিয়েছে। তার মৃত্যুতে তিনি গভীরভাবে শোকাহত। একই সঙ্গে তিনি মরহুমের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, স্বজন ও সহকর্মীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মোট ৭৩ হাজার ৬৯৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এ সময় পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ২২৫ জন।
চলতি বছরে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে সেপ্টেম্বর মাসে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭ হাজার ৮৪৮ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী। অন্যদিকে ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে পুরুষের হার ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নারীর হার ৫৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন সামনে থেকে লড়াই করছেন, ঠিক সেই সময় একজন চিকিৎসকের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা চিকিৎসক সমাজ ও তার স্বজনদের জন্য আরও বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে। ডেঙ্গু ইউনিটে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ডেঙ্গুর কাছে হার মানা ডা. আঁচল রায়ের মৃত্যু তাই সহকর্মীদের কাছে এক গভীর শোকের ঘটনা হয়ে থাকবে।