সারাবিশ্ব
চকলেট দেয়ার কথা বলে অফিসের সব কর্মীকে আইফোন উপহার দিলেন নারী বস
কর্মীদের হাতে চকলেট তুলে দিয়ে ছোট্ট একটি প্র্যাঙ্ক করতে চেয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এক ব্যবসায়ী নারী। কিন্তু সেই চকলেটের প্যাকেট খুলতেই অপেক্ষা করছিল বড় চমক। কয়েকজন কর্মীর হাতে উঠে আসে একেবারে নতুন আইফোন ১৮। আর যাদের ভাগ্যে প্রথমে জোটে বড় চকলেট বার, তারাও শেষ পর্যন্ত পান একই উপহার। কর্মীদের খুশি রাখা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আনুগত্য বাড়াতে নেওয়া এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তা ভাইরাল হয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ব্যবসায়ী এবং ওয়ার্ল্ড স্টার হোল্ডিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিনা নিশাদের কর্মীদের আইফোন উপহার দেওয়ার ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং তাদের সন্তুষ্ট রাখাকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
খালিজ টাইমসকে হাসিনা নিশাদ বলেন, ‘কর্মীরাই আমাদের শক্তি। তাদের ছাড়া আমাদের কোনো উন্নতি সম্ভব নয়। তাই প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকেই কর্মীদের পেছনে বিনিয়োগ করাকে আমার স্বামী ও আমি অগ্রাধিকার দিয়ে আসছি।’
স্বামী নিশাদ হুসাইনের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করেন হাসিনা। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান নিশাদ হুসাইন জনবল সরবরাহ বা ম্যানপাওয়ার সেবা নিয়ে কাজ করেন। ২০০৮ সালে স্বামী-স্ত্রী মিলে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু করেন। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বড় হলেও কর্মীদের গুরুত্ব দেওয়ার নীতি এখনও অটুট রয়েছে বলে জানান তারা।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে হাসিনা নিশাদকে কয়েকজন কর্মীর মধ্যে প্যাকেট বিতরণ করতে দেখা যায়। পরে সেই মুহূর্তের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। প্যাকেটগুলোর একাংশে ছিল নতুন আইফোন ১৮, আর অন্য প্যাকেটগুলোতে ছিল বড় আকারের চকলেট বার। কর্মীরা যখন নিজেদের প্যাকেট খুলছিলেন, তখনই প্রকাশ পায় এই চমকের বিষয়টি।
তবে গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল এরপর। যেসব কর্মী প্রথমে চকলেট পেয়েছিলেন, তাদের কেউ হতাশ হননি। বরং তারা হাসিমুখে নিজেদের উপহার গ্রহণ করেন। পরে হাসিনা তাদের প্রত্যেকের হাতেও তুলে দেন নতুন আইফোন। ফলে চকলেট দিয়ে শুরু হওয়া ছোট্ট প্র্যাঙ্ক শেষ হয় সবার হাতে দামি উপহার তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে।
হাসিনা জানান, মূলত প্রতিষ্ঠানের সেরা পারফর্ম করা ১২ জন কর্মীকে এই বিশেষ উপহার দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘চকলেটগুলো ছিল আমাদের করা ছোট্ট একটি প্র্যাঙ্ক। তবে সেখানে থাকাকালে আমি লক্ষ্য করেছি, যারা চকলেট পেয়েছিলেন, তাদের কেউই হতাশ হননি। তারা যা পেয়েছেন, খুশি মনে তা গ্রহণ করেছেন। অবশ্য আমরা যখন তাদের ফোন দিলাম, তখন তারা ভীষণ আনন্দিত হয়েছেন। তাদের মুখের আনন্দই আমাদের জন্য একটি উপহার।’
কর্মী ধরে রাখতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
কর্মীদের উৎসাহিত করা এবং দীর্ঘদিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রাখার জন্য হাসিনা ও নিশাদ এমন উদ্যোগ এবারই প্রথম নেননি। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে কর্মীদের জন্য ব্যতিক্রমী পুরস্কার ও আয়োজন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত বছরও সেরা পারফর্ম করা কর্মীদের আইফোন উপহার দেওয়া হয়েছিল।
এর আগে ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানের ১৬ জন কর্মীর জন্য বিশেষ আয়োজন করা হয়। তাদের জন্য পাঁচ তারকা হোটেলে থাকার ব্যবস্থা, চালকসহ বিলাসবহুল গাড়িতে ভ্রমণ এবং ইয়টে পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল। এর এক বছর আগে, ২০২৩ সালে কর্মীদের জন্য বিশেষ সিনেমা প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়।
হাসিনার দাবি, কর্মীদের স্বীকৃতি ও বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার এই নীতি প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষ কর্মী ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। তার ভাষায়, প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা খুবই কম। এমন অনেক কর্মী রয়েছেন, যারা প্রতিষ্ঠানটির শুরুর সময় থেকেই তাদের সঙ্গে কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মীরা খুব কমই প্রতিষ্ঠান ছাড়েন। এমন কিছু কর্মী আছেন, যারা প্রতিষ্ঠান শুরুর দিন থেকেই আমাদের সঙ্গে আছেন। তাদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন।’
কর্মীদের জন্য খেলাধুলারও আয়োজন
শুধু আর্থিক পুরস্কার বা দামি উপহার নয়, কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার দিকেও গুরুত্ব দেয় প্রতিষ্ঠানটি। কর্মীদের মধ্যে দলীয় মনোভাব ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা বাড়াতে নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়।
হাসিনা জানান, পুরো কোম্পানিকে চারটি দলে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি বছর আয়োজন করা হয় প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া দিবস। পাশাপাশি প্রতি মাসে কর্মীদের খেলাধুলার অনুশীলনের জন্য নির্দিষ্ট বাজেটও রাখা হয়।
তার মতে, এসব কার্যক্রম কর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও প্রতিযোগিতার মনোভাব বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতেও সহায়তা করে।
‘কর্মীরাই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু’
২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করার সময় হাসিনা ও নিশাদ ছাড়া সেখানে আর কেউ ছিলেন না। ধীরে ধীরে কর্মী ও ব্যবসার পরিধি বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অনেক বিস্তৃত হলেও কর্মীদের গুরুত্ব দেওয়ার নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
হাসিনা বলেন, ‘শুরুতে শুধু আমার স্বামী আর আমি ছিলাম। বছরের পর বছর ধীরে ধীরে আমরা প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছি এবং কর্মীরাই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কর্মীদের যথাযথ যত্ন নিলে প্রতিষ্ঠান নিজে থেকেই এগিয়ে যাবে।’
কর্মীদের হাতে চকলেট দেওয়ার ছোট্ট প্র্যাঙ্ক থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত সবার হাতে নতুন আইফোন তুলে দেওয়া-হাসিনা নিশাদের এই উদ্যোগ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার বিষয়। প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতি এমন ব্যতিক্রমী স্বীকৃতি ও পুরস্কারের উদ্যোগই যে তাদের কর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ তৈরি করছে, সেটিই তুলে ধরেছে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি।