রাজনীতি
৭ নভেম্বরের চেতনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেছে: রুহুল কবির রিজভী
ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের চেতনা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে দেশের মানুষকে জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এ দিনটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের জেগে ওঠা এবং সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পেছনেও ৭ নভেম্বরের চেতনা প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয়তাবাদী ওলামা দল এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করলেও পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা শাসকদের কর্মকাণ্ডে দেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। সে সময় যারা দেশের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রতিবাদ করেছিলেন, তাঁদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হয়েছিল। রক্ষীবাহিনী গঠন করে বিরোধীদের হত্যা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির এই নেতা বলেন, ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে সে সময় সব রাজনৈতিক দল ও সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। মানুষের মতপ্রকাশ ও কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে জনগণ ও সৈনিকেরা রাজপথে নেমে আসেন। তাঁর ভাষায়, ৭ নভেম্বর ছিল সৈনিক-জনতার এক অভূতপূর্ব বিপ্লব, যা বাকশাল পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।
রিজভী আরও বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জনগণের সমর্থনে নেতৃত্ব গ্রহণের পর দেশে রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের পথ উন্মুক্ত করেন। তাঁর শাসনামলে একাধিক টেলিভিশন ও সংবাদপত্র চালু হয় এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পায়। এর মাধ্যমে দেশে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে রুহুল কবির রিজভী বলেন, সে সময় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক উদ্যোগের ফলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। কলকারখানার উৎপাদনও সচল হয়। এ ছাড়া গ্রাম পুলিশ ও মহিলা পুলিশ ব্যবস্থা চালু এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, উভয় আন্দোলনেই মানুষ অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে জেগে উঠেছিল। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে দীর্ঘ ১৭ বছর দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন চলেছে। এ সময় গুম, খুন ও গুপ্তহত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র, শ্রমিক, রিকশাচালকসহ সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে। এই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, আন্দোলনে প্রাণ হারানো প্রত্যেকের হত্যার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে।
বিশেষ করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদসহ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের হত্যার বিচার দাবি করেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, কোনো হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন বাদ না পড়ে। প্রতিটি হত্যার জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
৭ নভেম্বরের চেতনা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দেশের জনগণ ও জাতীয়তাবাদী শক্তি এখনো সেই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নির্ভীক ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশকে কোনো দেশের সেবাদাসে পরিণত হতে দেওয়া হবে না। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শ ও প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, বিএনপির রাজনীতি সহজ-সরল পথের রাজনীতি, সিরাতুল মুস্তাকিমের রাজনীতি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁদের অঙ্গীকার থেকে কখনো সরে যাননি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তাঁর প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হননি বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে ইসলামের নামে রাজনীতি করা কিছু দলের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগও তোলেন বিএনপির এই নেতা।
অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা ও বক্তব্য শেষে রুহুল কবির রিজভী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের মধ্যে পবিত্র কোরআন শরিফসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন।