সারাবিশ্ব

উপসাগরীয় ছয় দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগে বড় উদ্যোগ, স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক চুক্তি


সারাবিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

উপসাগরীয় ছয় দেশের মধ্যে রেল যোগাযোগে বড় উদ্যোগ, স্বাক্ষরিত হলো ঐতিহাসিক চুক্তি
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেই আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয় সদস্য রাষ্ট্র। দেশগুলোর মধ্যে আন্তসীমান্ত রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ এবং একটি সমন্বিত আঞ্চলিক রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে জিসিসিভুক্ত দেশগুলো। রবিবার (৮ নভেম্বর) বাহরাইনের আল-রিফা প্রাসাদে অনুষ্ঠিত সদস্য দেশগুলোর পরিবহনমন্ত্রীদের বৈঠকে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তিটির মাধ্যমে কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ও ওমানকে একটি সমন্বিত রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ছয় দেশের মধ্যে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন আরও সহজ, দ্রুত ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর পরিবহন ও যোগাযোগবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটির ৩১তম সভার পাশাপাশি এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাহরাইনের ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স সালমান বিন হামাদ আল খলিফা, জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই এবং ছয় সদস্য রাষ্ট্রের পরিবহন ও যোগাযোগবিষয়ক মন্ত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। চুক্তির আওতায় একটি সমন্বিত রেল নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রেল যোগাযোগের কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের পর জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই উদ্যোগটিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিবহন খাতে আঞ্চলিক সংহতি জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি একক, সমন্বিত ও আন্তঃকার্যক্ষম রেল যোগাযোগ নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনায় সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে নতুন গতি আসবে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য জিসিসির ছয় সদস্য রাষ্ট্রের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আল-বুদাইউই। যৌথ আঞ্চলিক প্রকল্পগুলোর প্রতি তাঁদের ধারাবাহিক সমর্থন এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর জনগণের কল্যাণে কৌশলগত উদ্যোগগুলো এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনার জন্য তিনি ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট জাতীয় দল এবং ‘গালফ রেলওয়ে অথরিটি’র ভূমিকা ও প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তিনি।

আল-বুদাইউই আরও বলেন, এই রেল প্রকল্প শুধু পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নয়; বরং এটি উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, পারস্পরিক সংযোগ ও অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর মতে, আরও বেশি আন্তঃসংযুক্ত একটি পরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং এ অঞ্চলের মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে।

জিসিসি সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত আঞ্চলিক রেলপথটির মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার। কুয়েত থেকে শুরু হয়ে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্য দিয়ে ওমানের রাজধানী মাস্কাট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এই রেল নেটওয়ার্ক।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, রেলপথের একটি অংশ কুয়েত থেকে সৌদি আরবের দাম্মাম পর্যন্ত যাবে। সেখান থেকে একটি সংযোগের মাধ্যমে বাহরাইনের সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপন করা হবে। অন্য একটি অংশ সৌদি আরবের দাম্মামকে সালওয়া সীমান্ত ক্রসিংয়ের মাধ্যমে কাতারের সঙ্গে যুক্ত করবে। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আন্তসীমান্ত রেল চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে।

পরবর্তী অংশে রেল নেটওয়ার্কটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও আল আইন শহরের মধ্য দিয়ে ওমানে প্রবেশ করবে। সেখান থেকে সুহার হয়ে রেলপথটি পৌঁছাবে রাজধানী মাস্কাটে। এভাবে ছয়টি দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলোকে একই রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রস্তাবিত রেল নেটওয়ার্কে যাত্রীবাহী ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২২০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। অন্যদিকে মালবাহী ট্রেনের গতিসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ঘণ্টায় ৮০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। ফলে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনেও এই রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয় দেশের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে আন্তসীমান্ত যাতায়াত সহজ হওয়া, পরিবহন ব্যয় ও সময় কমানো, পণ্য সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংহতি আরও জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।